যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষার স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির এক শিক্ষার্থীকে ফেডারেল এজেন্টরা আটক করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নাটকীয়ভাবে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানীর সাথে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি আলোচনার পর এই মুক্তি নিশ্চিত হয়। বৃহস্পতিবার ভোরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডরমিটরি থেকে এলমিনা আগায়েভা নামক ওই শিক্ষার্থীকে আটকের ঘটনায় ক্যাম্পাসজুড়ে তীব্র উত্তেজনা ও প্রতিবাদের সৃষ্টি হয়েছিল।
অভিযানের নেপথ্যে: ‘নিখোঁজ শিশু’ খোঁজার নাটক
বৃহস্পতিবার ভোরে কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির অফ-ক্যাম্পাস আবাসিক ভবনে হানা দেয় ডিপার্টমেন্ট অফ হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (DHS)-এর পাঁচজন এজেন্ট। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ক্লেয়ার শিপম্যান এক ভিডিও বার্তায় জানান, এজেন্টরা কোনো ওয়ারেন্ট ছাড়াই ভবনে প্রবেশ করে।
শিপম্যানের অভিযোগ অনুযায়ী, “এজেন্টরা মিথ্যা পরিচয় দিয়ে ভবনে ঢোকে। তারা দায়িত্বরত নিরাপত্তা কর্মীদের জানায় যে তারা পুলিশ এবং একজন ‘নিখোঁজ শিশু’কে খুঁজছে। এমনকি তারা একটি শিশুর ছবিও প্রদর্শন করে। একই অজুহাতে তারা ওই শিক্ষার্থীর অ্যাপার্টমেন্টে প্রবেশ করে। কিন্তু ভেতরে ঢোকার পর স্পষ্ট হয় যে তারা আসলে অভিবাসন সংক্রান্ত কারণে এলমিনাকে আটক করতে এসেছে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ক্যামেরাগুলোতে এজেন্টদের এই কর্মকাণ্ড ধরা পড়েছে। পাবলিক সেফটি অফিসার বারবার ওয়ারেন্ট দেখতে চাইলেও এজেন্টরা তা দেখাতে ব্যর্থ হয় এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলার সুযোগ না দিয়েই এলমিনাকে নিয়ে যাওয়া হয়। শিপম্যান এই ঘটনাকে ‘ভীতিজনক’ এবং ‘প্রটোকল লঙ্ঘন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
রাজনৈতিক মোড় ও মেয়র মামদানীর হস্তক্ষেপ
ঘটনাটি দ্রুত রাজনৈতিক মোড় নেয় যখন নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানী সরাসরি হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে দেখা করেন। মেয়র জানান, তিনি এলমিনার আটকের বিষয়ে প্রেসিডেন্টের কাছে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। কিছুক্ষণ পরেই প্রেসিডেন্ট তাকে জানান যে, এলমিনাকে ‘অবিলম্বে মুক্তি’ দেওয়া হবে।
মেয়র মামদানী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বিবৃতিতে বলেন, "প্রেসিডেন্টের সাথে বৈঠকে আমি এলমিনার আটকের বিষয়ে আমার উদ্বেগের কথা জানিয়েছিলাম। তিনি আমাকে নিশ্চিত করেছেন যে এলমিনাকে দ্রুত মুক্তি দেওয়া হচ্ছে।"
মুক্তির পর এলমিনা তার ইনস্টাগ্রামে একটি আবেগঘন পোস্ট দিয়ে লেখেন, "আমি মাত্রই বের হলাম। আমি নিরাপদ এবং বর্তমানে একটি উবারে করে বাসায় ফিরছি। যা ঘটেছে তাতে আমি সম্পূর্ণ স্তব্ধ।" উল্লেখ্য, এলমিনা আজারবাইজানের নাগরিক এবং তিনি কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে নিউরোসায়েন্স ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক করছেন।
ডিএইচএস-এর ব্যাখ্যা ও আইনি লড়াই
ডিপার্টমেন্ট অফ হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (DHS) এক বিবৃতিতে জানায়, এলমিনার স্টুডেন্ট ভিসা ২০১৬ সালে ওবামা প্রশাসনের সময় বাতিল করা হয়েছিল। কারণ হিসেবে বলা হয়, তিনি নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত ছিলেন না। তবে ডিএইচএস-এর বিবৃতিতে ‘মিথ্যা পরিচয়’ দিয়ে ভবনে ঢোকার অভিযোগ সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করা হয়নি। তারা দাবি করেছে, ভবনের ম্যানেজার এবং এলমিনার রুমমেট স্বেচ্ছায় তাদের ভেতরে ঢুকতে দিয়েছিল।
এলমিনার আইনজীবী কার্ল হারভিচ ফেডারেল আদালতে একটি জরুরি পিটিশন দাখিল করেছিলেন। সেখানে বলা হয়েছে, কোনো বৈধ ওয়ারেন্ট ছাড়াই এবং স্রেফ ‘নিখোঁজ ব্যক্তি’ খোঁজার দোহাই দিয়ে তার মক্কেলকে বেআইনিভাবে আটক করা হয়েছে।
গর্ভনর ও প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া
নিউ ইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হোকল এই অভিযানের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, “ঘটনাটি পরিষ্কার: আইস (ICE) এজেন্টদের কাছে প্রয়োজনীয় ওয়ারেন্ট ছিল না, তাই তারা এক শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত বাসভবনে ঢুকতে মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে।”
কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির সাথে ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বন্দ্ব এটিই প্রথম নয়। গত বছর ফিলিস্তিনপন্থী অধিকারকর্মী মাহমুদ খলিলকেও অভিবাসন অভিযোগে ১০৪ দিন আটকে রাখা হয়েছিল। এছাড়া ইহুদি শিক্ষার্থীদের হয়রানি ঠেকাতে ব্যর্থতার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয়টি ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে ২০০ মিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে বাধ্য হয়েছিল।
বিশ্লেষক অভিমত: ক্ষমতার অপপ্রয়োগ নাকি আইনি বাধ্যবাধকতা?
কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির এই ঘটনাটি বর্তমান আমেরিকার রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে গভীর কিছু উদ্বেগের জন্ম দেয়। এখানে প্রধান তিনটি দিক বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন:
১. প্রশাসনিক সততা ও ‘সেফ হ্যাভেন’ নীতি:
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঐতিহাসিকভাবে ‘নিরাপদ আশ্রয়’ হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু যেভাবে ফেডারেল এজেন্টরা ‘নিখোঁজ শিশু’ খোঁজার দোহাই দিয়ে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে ক্যাম্পাসে ঢুকল, তা মার্কিন আমলাতন্ত্রের নৈতিকতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। যদি আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিজেই আইন লঙ্ঘনের (মিথ্যা তথ্য দেওয়া) মাধ্যমে আইন প্রয়োগ করতে চায়, তবে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও অবিশ্বাসের জন্ম নেবে। এটি ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য আমেরিকাকে একটি অনিরাপদ গন্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করবে।
২. প্রেসিডেন্টের একক ক্ষমতা ও মেয়র মামদানীর ভূমিকা:
এলমিনার মুক্তি পাওয়ার প্রক্রিয়াটি বিস্ময়কর। যেখানে একটি আইনি প্রক্রিয়া (Habeas Corpus) চলছিল, সেখানে মেয়রের সাথে কথা বলে প্রেসিডেন্টের মৌখিক আদেশে মুক্তি পাওয়া ইঙ্গিত দেয় যে, অভিবাসন ফাইলগুলো এখন আইনি ব্যবস্থার চেয়ে রাজনৈতিক ইচ্ছার ওপর বেশি নির্ভরশীল। এটি একাধারে প্রেসিডেন্টের ‘ক্ষমতা প্রদর্শনী’ এবং মেয়রের রাজনৈতিক প্রভাবকে ফুটিয়ে তোলে।
৩. ট্রাম্প প্রশাসনের ‘গণ-ডিপোর্টেশন’ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান:
২০১৬ সালের একটি পুরনো ওবামা আমলের ভিসা ইস্যুকে ১০ বছর পর সামনে আনা প্রমাণ করে যে, বর্তমান প্রশাসন প্রতিটি ফাইল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তল্লাশি করছে। তবে কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির মতো বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্রে এ ধরনের অভিযান মুক্তচিন্তার চর্চাকারীদের মধ্যে ভীতি তৈরির একটি কৌশল হতে পারে। বিশেষ করে যারা প্রভাবশালী বা কণ্ঠস্বর সোচ্চার, তাদের লক্ষ্যবস্তু করে সাধারণ অভিবাসীদের মধ্যে একটি ‘ভয়ের সংস্কৃতি’ প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চলছে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন।
এলমিনা মুক্তি পেলেও তার বিরুদ্ধে আনা অভিবাসন মামলাটি এখনো শেষ হয়নি। এই ঘটনাটি আগামী দিনে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতি এবং উদারপন্থী স্টেটগুলোর (যেমন নিউ ইয়র্ক) মধ্যে সংঘর্ষের একটি নতুন ফ্রন্ট খুলে দিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রটোকল লঙ্ঘন করে এই ধরনের অভিযান ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা ও আইনের শাসনের মধ্যে যে ফাটল তৈরি করবে, তার মাসুল হয়তো দীর্ঘ মেয়াদে মার্কিন সমাজকেই দিতে হবে।