স্পিনার সানজিদা আকতার মেঘলার বিধ্বংসী বোলিং এবং ব্যাটারদের নিয়ন্ত্রিত পারফরম্যান্সে আইসিসি নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে দাপুটে জয় অব্যাহত রেখেছে বাংলাদেশ। বৃহস্পতিবার টুর্নামেন্টের এ গ্রুপে নিজেদের তৃতীয় ম্যাচে নামিবিয়াকে ৮০ রানের বিশাল ব্যবধানে হারিয়েছে নিগার সুলতানা জ্যোতির দল। এই জয়ের ফলে টানা তিন ম্যাচ জিতে পূর্ণ ৬ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের শীর্ষস্থান মজবুত করার পাশাপাশি টুর্নামেন্টের সুপার সিক্স পর্ব নিশ্চিত করল লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। আগামী জুনে ইংল্যান্ডের মাটিতে অনুষ্ঠিতব্য টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে জায়গা করে নেওয়ার পথে এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা মাত্র।
নেপালের কীর্তিপুরে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে টস জিতে বাংলাদেশকে প্রথমে ব্যাটিংয়ের আমন্ত্রণ জানায় নামিবিয়া। তবে শুরুটা আশানুরূপ হয়নি বাংলাদেশের জন্য। ইনিংসের প্রথম ওভারেই ওপেনার জুয়াইরিয়া ফেরদৌস কোনো রান না করেই সাজঘরে ফিরে যান। প্রাথমিক ধাক্কা সামাল দিতে হাল ধরেন আরেক ওপেনার দিলারা আকতার এবং শারমিন আক্তার। তাদের ব্যাটে ৩৩ রানের একটি কার্যকরী জুটি গড়ে ওঠে। ব্যক্তিগত ২৫ রান করে দিলারা এবং ১৩ রান করে শারমিন আউট হলে ৪৪ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে কিছুটা চাপে পড়ে দল।
চাপের মুখে মিডল অর্ডারে দলের হাল ধরেন অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতি এবং সোবহানা মোস্তারি। এই অভিজ্ঞ দুই ব্যাটার উইকেটে থিতু হয়ে ৪৬ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়েন। নিগার ২১ রান করে বিদায় নিলেও সোবহানা ২৭ রানের একটি ঝোড়ো ইনিংস খেলেন, যাতে ছিল একটি চার ও দুটি দৃষ্টিনন্দন ছক্কার মার। ইনিংসের শেষ ভাগে স্বর্ণা আকতারের ১৮ বলে ২৩ রান এবং রাবেয়া খানের ৫ বলে অপরাজিত ১১ রানের ক্যামিওতে ভর করে নির্ধারিত ২০ ওভারে ৭ উইকেট হারিয়ে ১৪৪ রানের চ্যালেঞ্জিং স্কোর দাঁড় করায় বাংলাদেশ।
১৪৫ রানের জয়ের লক্ষ্যে ব্যাটিং করতে নেমে বাংলাদেশের বোলারদের তোপের মুখে পড়ে নামিবিয়ার ব্যাটাররা। শুরু থেকেই নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারিয়ে তারা কোণঠাসা হয়ে পড়ে। বিশেষ করে সানজিদা আকতার মেঘলার ঘূর্ণি জাদুতে দিশেহারা হয়ে পড়ে নামিবিয়ার মিডল অর্ডার। মাত্র ১৭.৫ ওভারে ৬৪ রানেই গুটিয়ে যায় তাদের ইনিংস। দলের পক্ষে অধিনায়ক সুনে উইটমান সর্বোচ্চ ১৯ রান করলেও বাকি ব্যাটারদের কেউই বাংলাদেশি বোলারদের সামনে দাঁড়াতে পারেননি। পুরো ইনিংসে মাত্র দুইজন ব্যাটার দুই অংকের ঘরে পৌঁছাতে সক্ষম হন।
বাংলাদেশের পক্ষে বল হাতে অসামান্য পারফরম্যান্স প্রদর্শন করেন মেঘলা। তিনি মাত্র ১৪ রান খরচ করে একাই তুলে নেন ৪টি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট। তার এই ম্যাচজয়ী বোলিংয়ের কারণে তাকে ম্যাচ সেরার পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। এছাড়া রাবেয়া খান এবং ফাহিমা খাতুন প্রত্যেকেই ৩টি করে উইকেট নিয়ে নামিবিয়ার ব্যাটিং লাইআপের মেরুদণ্ড ভেঙে দেন। বোলারদের এমন সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ৮০ রানের বিশাল জয় নিশ্চিত হয়।
এর আগে নিজেদের প্রথম দুই ম্যাচে বাংলাদেশ যথাক্রমে যুক্তরাষ্ট্রকে ২১ রানে এবং পাপুয়া নিউ গিনিকে ৩০ রানে পরাজিত করেছিল। টানা তিন জয়ের এই আত্মবিশ্বাস নিয়ে বাংলাদেশ দল এখন সুপার সিক্সের লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত। বাছাই পর্বের নিয়ম অনুযায়ী, সুপার সিক্সের শীর্ষ চারটি দল ইংল্যান্ড বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলার সুযোগ পাবে। বর্তমান ফর্ম বিবেচনায় বাংলাদেশ অন্যতম ফেভারিট হিসেবে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছে। আগামী ২৪ জানুয়ারি গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে আয়ারল্যান্ডের মুখোমুখি হবে জ্যোতিরা। সেই ম্যাচেও জয় তুলে নিয়ে অপরাজিত থেকে পরবর্তী পর্বে যেতে মুখিয়ে আছে বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল।
বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের এই ধারাবাহিক সাফল্য তাদের পেশাদারিত্ব ও প্রস্তুতির স্বাক্ষর বহন করে। বিশেষ করে স্পিন বিভাগে মেঘলা ও রাবেয়াদের ফর্ম প্রতিপক্ষ দলগুলোর জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যাটারদের বড় লক্ষ্য তাড়া করার ক্ষমতা এবং বোলারদের ছোট পুঁজিতেও লড়াই করার মানসিকতা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও সুসংহত করছে। ইংল্যান্ড বিশ্বকাপের মূল পর্বে যাওয়ার পথে এই জয়গুলো কেবল গাণিতিক সুবিধাই দিচ্ছে না, বরং দলের আত্মবিশ্বাসকে তুঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে আসন্ন ম্যাচটি গ্রুপের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের লড়াই হিসেবে বিবেচিত হবে।