চলতি মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক কয়েকটি মুসলিম ও আফ্রিকান দেশের নাগরিকদের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা জারির প্রতিক্রিয়ায় এবার পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে মালি ও বুর্কিনা ফাসো। পশ্চিম আফ্রিকার এই দেশ দুটি মঙ্গলবার মার্কিন নাগরিকদের জন্য তাদের সীমান্ত পুরোপুরি বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক কঠোর ভিসা নীতির বিপরীতে এটিকে দেশ দুটির 'ইটের বদলে পাটকেল' নীতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মালির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, পারস্পরিক সমমর্যাদার নীতির ভিত্তিতে তারা মার্কিন নাগরিকদের ওপর ঠিক সেই একই শর্ত ও বিধি-নিষেধ আরোপ করছে যা বর্তমানে মালির নাগরিকদের ওপর যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োগ করছে। বুর্কিনা ফাসোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী কারামোকো জঁ-মারি ট্রাওরেও অনুরূপ এক বিবৃতিতে একই পদক্ষেপের কথা নিশ্চিত করেছেন। এর আগে গত শুক্রবার পশ্চিম আফ্রিকার আরেক দেশ নাইজারও মার্কিন নাগরিকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। উল্লেখ্য, মালি, বুর্কিনা ফাসো ও নাইজার—এই তিন দেশ মিলে ২০২৪ সালে সাহেল রাষ্ট্র জোট গঠন করে, যাদের সবকটিই বর্তমানে সামরিক শাসনাধীন।
মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে গত ১৬ ডিসেম্বর এই নতুন বিধিনিষেধ জারি করা হয়, যা চলতি বৃহস্পতিবার থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে। এতে মালি, বুর্কিনা ফাসো ও নাইজার ছাড়াও লাওস, সিয়েরা লিওন, দক্ষিণ সুদান ও সিরিয়ার নাগরিকদের ওপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এমনকি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের ইস্যু করা ভ্রমণ নথি বহনকারীদেরও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ওয়াশিংটন এই সিদ্ধান্তের পেছনে জাতীয় নিরাপত্তা, দুর্বল তথ্য আদান-প্রদান এবং সন্ত্রাসবাদের উপস্থিতিকে কারণ হিসেবে দেখিয়েছে। থিঙ্ক ট্যাঙ্ক কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস জানিয়েছে, বর্তমানে বিশ্বের ৩৯টি দেশের নাগরিক ট্রাম্পের এই ভিসা বিধিনিষেধের কবলে পড়েছেন, যার মধ্যে ২৬টিই আফ্রিকান দেশ।
পূর্ণ ভিসা নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা দেশসমূহ:
আফগানিস্তান, বুর্কিনা ফাসো (আফ্রিকা), চাদ (আফ্রিকা), ইকুয়েটোরিয়াল গিনি (আফ্রিকা), ইরিত্রিয়া (আফ্রিকা), হাইতি, ইরান, লাওস, লিবিয়া (আফ্রিকা), মালি (আফ্রিকা), মিয়ানমার, নাইজার (আফ্রিকা), কঙ্গো প্রজাতন্ত্র (আফ্রিকা), সিয়েরা লিওন (আফ্রিকা), সোমালিয়া (আফ্রিকা), দক্ষিণ সুদান (আফ্রিকা), সুদান (আফ্রিকা), সিরিয়া ও ইয়েমেন। এছাড়া ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের ইস্যু করা ভ্রমণ নথি বহনকারীদের ওপরও পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
আংশিক ভিসা বিধিনিষেধের আওতায় থাকা দেশসমূহ:
অ্যাঙ্গোলা (আফ্রিকা), অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডা, বেনিন (আফ্রিকা), বুরুন্ডি (আফ্রিকা), কিউবা, ডোমিনিকা, গ্যাবন (আফ্রিকা), গাম্বিয়া (আফ্রিকা), আইভরি কোস্ট (আফ্রিকা), মালাউই (আফ্রিকা), মৌরিতানিয়া (আফ্রিকা), নাইজেরিয়া (আফ্রিকা), সেনেগাল (আফ্রিকা), তানজানিয়া (আফ্রিকা), টোগো (আফ্রিকা), টোঙ্গা, তুর্কমেনিস্তান, ভেনেজুয়েলা, জাম্বিয়া (আফ্রিকা) ও জিম্বাবুয়ে (আফ্রিকা)।
ট্রাম্পের এই দ্বিতীয় মেয়াদে আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন কেবল ভিসাতেই সীমাবদ্ধ নেই। দীর্ঘদিনের অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য কর্মসূচি 'অ্যাগোয়া' (এজিওএ) গত সেপ্টেম্বরে নবায়ন না হওয়ায় আফ্রিকান দেশগুলো বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। এই কর্মসূচির আওতায় আফ্রিকার হাজার হাজার পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধায় মার্কিন বাজারে প্রবেশ করত, যা প্রায় ১৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান টিকিয়ে রেখেছিল। এখন শুল্কমুক্ত সুবিধার বদলে দেশগুলো চড়া ট্যারিফের সম্মুখীন হচ্ছে। এমনকি দক্ষিণ আফ্রিকার ওপর ৩০ শতাংশ বাড়তি শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।
সহায়তা ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের রদবদল এনেছে ট্রাম্প প্রশাসন। ২০২৫ সালের শুরুতে মার্কিন সাহায্য সংস্থা ইউএসএআইডি বন্ধ করে দেওয়ায় এবং বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক সাহায্য কমিয়ে দেওয়ায় সোমালিয়া, নাইজেরিয়া ও কেনিয়ায় তীব্র খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়ন কমে যাওয়ায় লেসোথো ও দক্ষিণ আফ্রিকায় এইচআইভি প্রতিরোধ কর্মসূচি হুমকির মুখে পড়েছে। সামরিক ক্ষেত্রে অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র তৎপরতা বজায় রেখেছে। আল-শাবাব ও আইএসআইএস দমনের নামে সোমালিয়া ও নাইজেরিয়ায় ড্রোন হামলা ও সামরিক অভিযান জোরদার করেছে মার্কিন বাহিনী। তবে নাইজেরিয়ার মতো দেশগুলো বলছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের অভ্যন্তরীণ সংকটকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে।
সব মিলিয়ে জোহরান মামদানী নিউ ইয়র্কের মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণের প্রাক্কালে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আফ্রিকার দেশগুলোর এই কূটনৈতিক যুদ্ধ এক নতুন উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে।