এখন সময় ডেস্ক • প্রকাশিত: ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৭:৪৩ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

মার্কিন দূতের ‘বাইবেলীয়’ তত্ত্বে মুসলিম বিশ্বে তীব্র ক্ষোভ

মার্কিন দূতের ‘বাইবেলীয়’ তত্ত্বে মুসলিম বিশ্বে তীব্র ক্ষোভ

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে চরম হুমকির মুখে ফেলে ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি এক বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন। একটি সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেছেন, বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী ইসরায়েল যদি পুরো মধ্যপ্রাচ্য দখল করে নেয়, তবে তাতে কোনো ভুল নেই। তার এই ‘উস্কানিমূলক’ মন্তব্যের পর আরব ও মুসলিম বিশ্বের দেশগুলো একযোগে তীব্র নিন্দা ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিশর, জর্ডান এবং সৌদি আরবসহ ১৪টিরও বেশি রাষ্ট্র ও সংস্থা একটি যৌথ বিবৃতিতে হাকাবির এই বক্তব্যকে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন এবং গাজা যুদ্ধ বন্ধের চলমান প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে এক বিশাল অন্তরায় হিসেবে অভিহিত করেছে।

ঘটনার সূত্রপাত: টাকার কার্লসনের সেই বিতর্কিত সাক্ষাৎকার

ঘটনাটি শুরু হয় গত শুক্রবার যখন প্রভাবশালী মার্কিন রাজনৈতিক ভাষ্যকার টাকার কার্লসনের সাথে হাকাবির একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। সাক্ষাৎকারে কার্লসন বাইবেলের একটি নির্দিষ্ট আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রশ্ন করেন—যেখানে নীল নদ থেকে ইউফ্রেটিস (ফোরাত) নদী পর্যন্ত অঞ্চলকে ইসরায়েলের বংশধরদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে বলে উল্লেখ আছে—সেই বিশাল অঞ্চল কি ইসরায়েলের অধিকারভুক্ত হওয়া উচিত?

উত্তরে রাষ্ট্রদূত হাকাবি সরাসরি বলেন, "ইসরায়েল যদি এই পুরো অঞ্চলটি দখল করে নেয়, তবে সেটি ঠিকই হবে (It would be fine if it took it all)।" যদিও পরে তিনি সুর নরম করে যোগ করেন যে, ইসরায়েল বর্তমানে তা করতে চাইছে না, বরং তারা যেটুকু এলাকা এখন তাদের দখলে আছে, সেটুকুর ওপর সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে চায়।

মুসলিম বিশ্বের ঐক্যবদ্ধ প্রতিক্রিয়া

হাকাবির এই মন্তব্য প্রকাশিত হওয়ার পরপরই মধ্যপ্রাচ্যসহ সারা বিশ্বের মুসলিম প্রধান দেশগুলো ক্ষোভে ফেটে পড়ে। রোববার সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটি যৌথ বিবৃতি জারি করা হয়। এই বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছে—মিশর, জর্ডান, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, তুরস্ক, সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, ওমান, বাহরাইন, লেবানন, সিরিয়া এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র। এছাড়া অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশন (ওআইসি), আরব লিগ এবং জিসিসি-ও এই নিন্দায় শামিল হয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়:

"রাষ্ট্রদূত হাকাবির মন্তব্য বিপজ্জনক এবং উস্কানিমূলক। এটি সার্বভৌম আরব দেশগুলোর ভূখণ্ড দখলের একটি প্রচ্ছন্ন সবুজ সংকেত, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। পশ্চিম তীরসহ দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের ওপর ইসরায়েলের কোনো সার্বভৌমত্ব নেই।"

দেশগুলো সতর্ক করে দিয়ে বলেছে যে, এই ধরনের বক্তব্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ‘গাজা শান্তি পরিকল্পনা’ এবং দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের যে কোনো সম্ভাবনাকে সমূলে বিনাশ করবে।

হাকাবির ‘বাইবেলীয় রাজনীতি’ ও মার্কিন কূটনীতির সংকট

বিশ্লেষক ডেস্ক: মাইক হাকাবির এই মন্তব্য কেবল একটি ব্যক্তিগত মত নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে। হাকাবি একজন কট্টর ইভানজেলিকাল খ্রিস্টান এবং তিনি দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের কড়া সমর্থক।

১. আন্তর্জাতিক আইনের অবমাননা: ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর থেকে পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম আন্তর্জাতিকভাবে ‘দখলকৃত ভূখণ্ড’ হিসেবে স্বীকৃত। বর্তমানে সেখানে প্রায় ৭ লাখ ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী বাস করছে, যা ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক আদালতের (ICJ) এক ঐতিহাসিক পরামর্শমূলক রায়ে সম্পূর্ণ অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। হাকাবির বক্তব্য এই আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।

২. দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের অবসান? আরব দেশগুলোর আশঙ্কা, হাকাবির এই বক্তব্য ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্নকে চিরতরে কবর দিয়ে দিতে পারে। যেখানে ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করছে তারা যুদ্ধ বন্ধে কাজ করছে, সেখানে তাদেরই রাষ্ট্রদূতের এমন উগ্র সম্প্রসারণবাদী মন্তব্য দ্বিমুখী নীতির বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

৩. আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা: জর্ডান ও মিশরের মতো দেশগুলো যারা ইসরায়েলের সাথে শান্তি চুক্তিতে আবদ্ধ, তারা এখন অস্তিত্বের সংকটে পড়ার আশঙ্কা করছে। হাকাবির ‘নীল নদ থেকে ফোরাত’ তত্ত্ব কার্যকর হওয়া মানে এই দেশগুলোর সীমানা সংকুচিত হওয়া বা সার্বভৌমত্ব হারানো।

গাজা ও পশ্চিম তীরের বর্তমান পরিস্থিতি

হাকাবির এই বিতর্কিত বক্তব্যের সময়কালে গাজায় মানবিক বিপর্যয় চরমে পৌঁছেছে। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে এখন পর্যন্ত ৭২,০০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

অন্যদিকে, পশ্চিম তীরেও পরিস্থিতি উত্তপ্ত। ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এবং নতুন করে বসতি সম্প্রসারণের পদক্ষেপে ফিলিস্তিনিরা কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। সম্প্রতি ইসরায়েলি সরকার পশ্চিম তীরের বেশ কিছু প্রশাসনিক ক্ষমতা সরাসরি নিজেদের অধীনে নেওয়ার পদক্ষেপ নিয়েছে, যাকে অনেক বিশ্লেষক ‘কার্যত অ্যানেক্সেশন’ বা অন্তর্ভুক্তি বলে অভিহিত করেছেন।

মার্কিন দূতাবাস থেকে পরবর্তীতে এক ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে যে হাকাবির মন্তব্য ‘প্রসঙ্গহীনভাবে’ প্রচার করা হয়েছে। কিন্তু কূটনৈতিক মহলে এই ক্ষতি পূরণ হওয়া কঠিন। আরবের প্রভাবশালী দেশগুলো স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, যতক্ষণ পর্যন্ত ১৯৬৭ সালের সীমানা অনুযায়ী স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত না হচ্ছে, ততক্ষণ এই অঞ্চলে কোনো টেকসই শান্তি সম্ভব নয়। হাকাবির ‘বাইবেলীয় জাস্টিফিকেশন’ বা ধর্মীয় দোহাই দিয়ে ভূমি দখলের উস্কানি কেবল আগুনেই ঘি ঢালবে।