ঢাকা অফিস • প্রকাশিত: ০৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৭:৩০ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

ভোটের সমীকরণে বড় পরিবর্তন: আওয়ামী লীগের অর্ধেক ভোট যাচ্ছে বিএনপিতে

ভোটের সমীকরণে বড় পরিবর্তন: আওয়ামী লীগের অর্ধেক ভোট যাচ্ছে বিএনপিতে

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক ভূখণ্ডে এক বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপ। ‘আনকভারিং দ্য পাবলিক পালস: ফাইন্ডিংস ফ্রম আ নেশনওয়াইড সার্ভে’ শীর্ষক এই গবেষণায় দেখা গেছে, অতীতে আওয়ামী লীগকে সমর্থন করা ভোটারদের একটি বিশাল অংশ এখন অন্য দলের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন। বিশেষ করে, আগে যারা আওয়ামী লীগকে ভোট দিতেন, তাদের প্রায় অর্ধেক বা ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ এবার তাদের সমর্থন ব্যক্ত করেছেন বিএনপির পক্ষে। বুধবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে এক জনবহুল সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই চমকপ্রদ তথ্য প্রকাশ করা হয়।

কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন (সিআরএফ) এবং বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক ওপিনিয়ন স্টাডিজ যৌথভাবে এই দেশব্যাপী জরিপটি পরিচালনা করে। ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত দুই ধাপে এই তথ্য সংগ্রহ করা হয়। দেশের ৬৪ জেলার ১৮০টি সংসদীয় আসনের মোট ১১ হাজার ৩৮ জন ভোটারের সরাসরি মতামতের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে এই প্রতিবেদন। সংবাদ সম্মেলনে জরিপের ফলাফল বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করেন সিআরএফের স্ট্র্যাটেজিক কো-অর্ডিনেটর জাকারিয়া পলাশ। তার দেওয়া তথ্যানুযায়ী, আওয়ামী লীগের সাবেক ভোটারদের ২৯ দশমিক ৯ শতাংশ এবার জামায়াতে ইসলামীকে এবং ৬ দশমিক ৫ শতাংশ ভোটার নবগঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টিকে (এনসিপি) ভোট দেওয়ার কথা ভাবছেন। এ ছাড়া ১৩ শতাংশ ভোটার অন্যান্য দলকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশ ভোটার এখনো কোনো কূল-কিনারা করতে পারেননি।

নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রবল আগ্রহের বিষয়টিও জরিপে স্পষ্ট হয়েছে। অংশগ্রহণকারী ভোটারদের ৯০ শতাংশের বেশি জানিয়েছেন যে তারা এবারের নির্বাচনে ভোট দিতে কেন্দ্রে যেতে চান। মাত্র ৮ শতাংশ ভোটার এখনো ভোট দেওয়ার বিষয়ে অনিশ্চয়তা প্রকাশ করেছেন অথবা তাদের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। এবারের নির্বাচনে ভোটারদের মনস্তত্ত্বে সবচেয়ে বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে দুর্নীতি। জরিপ বলছে, ৬৭ দশমিক ৩ শতাংশ ভোটারই প্রার্থীর ব্যক্তিগত বা দলের দুর্নীতির বিষয়টি মাথায় রেখে ব্যালটে সিল মারবেন। দুর্নীতির পর ভোটারদের কাছে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তা। এর বিপরীতে ধর্মের প্রভাব কিছুটা কমেছে বলে মনে হচ্ছে; মাত্র ৩৫ দশমিক ৯ শতাংশ ভোটার ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে ধর্মকে গুরুত্ব দেবেন বলে জানিয়েছেন।

তরুণ ভোটারদের পছন্দের ক্ষেত্রেও এসেছে আমূল পরিবর্তন। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালের পর যারা প্রথমবারের মতো এবার জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেবেন, তাদের মধ্যে ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে পছন্দ করছেন। এই নতুন ভোটারদের ২৭ শতাংশ বিএনপিকে এবং ১৭ শতাংশ এনসিপিকে সমর্থন দিচ্ছেন। বাকি ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ তরুণ ভোটার এখনো সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন। এই পরিসংখ্যানটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, নতুন প্রজন্মের ভোটারদের মধ্যে আদর্শিক এবং রাজনৈতিক পছন্দের ক্ষেত্রে আগের তুলনায় বড় ধরনের মেরুকরণ ঘটেছে। ভোটাররা এখন শক্তিশালী নেতৃত্বের চেয়ে ‘জনদরদি’ বা মানুষের কথা ভাবেন—এমন নেতাকে বেশি পছন্দ করছেন। জাকারিয়া পলাশ জানান, ভোটাররা ব্যক্তিগত বিশেষ যোগ্যতার চেয়ে প্রার্থীর মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল মনোভাবকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

সংবাদ সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকা বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এবং নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির প্রফেসরিয়াল ফেলো এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির এক গভীর বিশ্লেষণ প্রদান করেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ যেহেতু এবারের নির্বাচনে সরাসরি অংশগ্রহণ করছে না, তাই তাদের বিশাল ভোটব্যাংকটি কোন দিকে যাবে, তা নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে মূল চাবিকাঠি হবে। তিনি জরিপের ইতিবাচক দিকের প্রশংসা করে বলেন, ভোটারদের মধ্যে ভোট দেওয়ার যে প্রবল ইচ্ছা দেখা যাচ্ছে, তা গণতন্ত্রের জন্য শুভ। তবে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতাও উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন, যে ৮ শতাংশ ভোটার এখনো দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছেন, ভোটের দিনের নিরাপত্তা ও পরিবেশ ভালো না থাকলে তাদের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। তখন হয়তো একটি বিশাল অংশ কেন্দ্রে নাও যেতে পারেন, যা নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রভাবিত করতে পারে।

নির্বাচন কমিশন ও সরকারের ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে এই অধ্যাপক আরও বলেন যে, ভোটারদের বিশেষ করে নারী ও বয়স্কদের নির্বিঘ্নে কেন্দ্রে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা দিতে হবে। সাধারণ মানুষের মনে ভোট নিয়ে যে উদ্বেগ বা শঙ্কা কাজ করছে, তা দূর করা জরুরি। সংবাদ সম্মেলনের সভাপতি এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাহাবুল হকও একই মত প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনে মানুষের উৎসাহ অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। তবে উৎসবের আমেজ থাকলেও ভেতরে ভেতরে একধরনের টেনশন কাজ করছে যে ভোট সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে কি না। ব্যালট বাক্স দখল বা সংঘাতের আশঙ্কা অনেক সাধারণ ভোটারের মনে এখনো উঁকি দিচ্ছে।

জরিপটির সামগ্রিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের মানুষ এখন পরিবর্তনের প্রত্যাশী। তারা শুধুমাত্র দলের পরিচয়ে নয়, বরং প্রার্থীর চারিত্রিক গুণাবলি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ভিত্তিতে নেতা নির্বাচন করতে চান। ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ ভোটার জানিয়েছেন তারা দল ও প্রার্থী উভয়কেই সমান গুরুত্ব দেবেন, ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ শুধু দলকে এবং ৩০ দশমিক ২ শতাংশ শুধু প্রার্থীর যোগ্যতাকে বিবেচনায় নেবেন। এই ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান প্রমাণ করে যে, সাধারণ ভোটাররা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। তারা প্রার্থীর স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে চান।

২০২৬ সালের এই আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে একটি বড় মোড় হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। সাবেক ক্ষমতাসীন দলের ভোটারদের যে বড় বিচ্যুতি এবং নতুন ভোটারদের যে নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ, তা নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। এখন সবার নজর নির্বাচনের দিনের পরিবেশের ওপর। সাধারণ মানুষ যদি নির্ভয়ে কেন্দ্রে গিয়ে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন, তবেই এই বিশাল জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটবে।