ঢাকা অফিস • প্রকাশিত: ০৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৫:১৩ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

ভোটের সমীকরণে বিএনপির নতুন মেরুকরণ

ভোটের সমীকরণে বিএনপির নতুন মেরুকরণ

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সুর ধ্বনিত হচ্ছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী এই পরিস্থিতিতে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কৌশল ও অবস্থান নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান যে বক্তব্য রেখেছেন, তা আগামী দিনের রাজনীতিতে এক সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তারেক রহমান স্পষ্ট করেছেন যে, জনগণ চাইলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সন্তানরাও রাজনীতিতে ফিরতে পারেন। এই বক্তব্যকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আওয়ামী লীগের প্রতি বিএনপির এক ধরনের ‘গ্রিন সিগনাল’ হিসেবে দেখছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল একটি সাধারণ রাজনৈতিক মন্তব্য নয়, বরং আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক নিজের দিকে টানার এক সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক বিনিয়োগ। বর্তমানে যখন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব দেশান্তরী এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিভিন্ন বিচারিক প্রক্রিয়া চলছে, ঠিক সেই মুহূর্তে তারেক রহমানের এই অন্তর্ভুক্তিমূলক বা ‘ইনক্লুসিভ’ রাজনীতির বার্তা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। বিএনপি এখন আর কেবল রাজপথের আন্দোলনকারী দল হিসেবে নয়, বরং একটি রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রস্তুত ও উদার গণতান্ত্রিক দল হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করতে চাইছে।

তারেক রহমানের এই বক্তব্যের নেপথ্যে গভীর রাজনৈতিক অংক কাজ করছে বলে মনে করা হচ্ছে। বর্তমানে মাঠে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দী হিসেবে অত্যন্ত সক্রিয় রয়েছে জামায়াতে ইসলামী। সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী জামায়াতকে এককভাবে মোকাবেলা করা এবং নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য বিএনপির প্রয়োজন একটি বিশাল ও সুসংগঠিত ভোট ব্যাংক। বিভিন্ন জরিপ ও মাঠ পর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের ঐতিহ্যবাহী ভোটারদের একটি বড় অংশ যারা বর্তমানে নেতৃত্বহীন এবং চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছেন, তারা জামায়াতের উত্থান ঠেকাতে বিএনপির দিকে ঝুঁকছেন। বিএনপির নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, আওয়ামী লীগের এই সেকুলার ভোটাররা শেষ পর্যন্ত ‘মন্দের ভালো’ হিসেবে বিএনপিকেই বেছে নেবে।

ঠিক এই কৌশলগত কারণেই বিএনপি ইদানীং বেশ নমনীয় অবস্থানে রয়েছে। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও প্রকাশ্যেই ঘোষণা দিয়েছেন যে, আওয়ামী লীগের ভালো ও নিরপরাধ নেতা-কর্মীদের কোনো ধরনের হয়রানি করবে না বিএনপি। তারেক রহমানের গ্রিন সিগনাল এবং মির্জা ফখরুলের এই ঘোষণা মূলত একই সূত্রে গাঁথা। মাঠের রাজনীতিতে আরেকটি দৃশ্যমান পরিবর্তন হলো আওয়ামী লীগের তৃণমূল ও মধ্যম সারির নেতা-কর্মীদের ঢালাওভাবে বিএনপিতে যোগদান। মামলার খড়্গ থেকে বাঁচতে এবং রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষায় অনেক আওয়ামী লীগ কর্মী বিএনপির ছায়াতলে আশ্রয় নিচ্ছেন। বিএনপিও কৌশলগত কারণে এদের সাদরে গ্রহণ করছে, যার মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শক্তিকে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া এবং জামায়াতের বিপরীতে নিজেদের ভিত্তি আরও মজবুত করা সম্ভব হচ্ছে।

নির্বাচনী জোট ও সরকার গঠন নিয়ে তারেক রহমান অত্যন্ত স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ঐক্য সরকার গঠনের প্রস্তাব তিনি সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন। তাঁর যুক্তি হলো, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে সরকার গঠন করলে শক্তিশালী বিরোধী দল থাকবে না। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি পরিষ্কার করেছেন যে, আগামী নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে সরকার গঠন করতে চায়। এটি জামায়াতের প্রতি একটি প্রচ্ছন্ন বার্তাও বটে যে, বিএনপি এখন আর জামায়াতের ওপর নির্ভরশীল নয়। বিভিন্ন জনমত জরিপ বলছে, বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী পদের দৌড়ে তারেক রহমান সবার চেয়ে এগিয়ে আছেন। বিএনপি আত্মবিশ্বাসী যে, নির্বাচনে তারা দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়লাভ করবে।

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও তারেক রহমান ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরছেন। ভারত বা চীনের দিকে অন্ধভাবে ঝুঁকে পড়ার চেয়ে তিনি জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে যারা সঠিক অংশীদার হবে, তাদের সঙ্গেই বন্ধুত্ব রাখা হবে। এটি ভারতের সঙ্গে বৈরীতা এড়িয়ে আবার চীনের প্রতিও অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হওয়ার একটি আধুনিক কূটনৈতিক কৌশল। এছাড়া তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থান এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের ওপর তিনি বিশেষ জোর দিয়েছেন, যা প্রমাণ করে যে বিএনপি অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্ন দেখিয়ে তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে চাইছে।

পরিশেষে বলা যায়, শেখ হাসিনার সন্তানদের রাজনীতিতে ফেরার বিষয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করা এবং আওয়ামী লীগের সমর্থকদের আশ্বস্ত করা মূলত বিএনপির একটি বড় ধরণের রাজনৈতিক কৌশল। এর মূল লক্ষ্য হলো যাতে আওয়ামী লীগের বিশাল ভোট ব্যাংক জামায়াতের দিকে না ঝুঁকে বা নির্বাচন বর্জন না করে বরং বিএনপির বাক্সে ভোট দেয়। ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে মাঠ এখন বিএনপির অনুকূলে থাকলেও, জামায়াতের মাঠ দখলের তৎপরতা এবং তাদের নীরব ভোট ব্যাংক শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের ফলে কী প্রভাব ফেলে, তা দেখার জন্য সময়ের অপেক্ষা করতে হবে। তবে তারেক রহমানের এই দূরদর্শী রাজনৈতিক চাল বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণের জন্ম দিয়েছে।