ঢাকা অফিস • প্রকাশিত: ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১০:০৭ পিএম • অনলাইন সংস্করণ

ভোটার মাইগ্রেশন বিতর্ক ও ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি

ভোটার মাইগ্রেশন বিতর্ক ও ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি

ঢাকার রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বিশেষ করে প্রবাসীদের জন্য পোস্টাল ব্যালটের সুবিধা চালু করার বিষয়টি নিয়ে যখন দেশজুড়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে, ঠিক তখনই ভোটার স্থানান্তর বা মাইগ্রেশন ইস্যুতে রাজপথের প্রধান দল বিএনপি এবং নির্বাচন কমিশনের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন এক স্নায়ুযুদ্ধ। দলটির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, আসন্ন নির্বাচনে জয়-পরাজয় নির্ধারণে একটি বিশেষ পক্ষ সুপরিকল্পিতভাবে নির্দিষ্ট কিছু আসনে বিপুলসংখ্যক ভোটার স্থানান্তর করেছে। তবে নির্বাচন কমিশন এই দাবিকে নাকচ করে দিয়ে বলছে, পরিসংখ্যানে অস্বাভাবিক কিছু নেই।

ঘটনার সূত্রপাত হয় যখন ঢাকা মহানগরীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভোটার স্থানান্তরের খবর তৃণমূল রাজনৈতিক কর্মীদের নজরে আসে। বিএনপি বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানায়। দলটির একটি প্রতিনিধি দল গত ১ ফেব্রুয়ারি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এ বিষয়ে তাদের উদ্বেগের কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। বৈঠক শেষে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান গণমাধ্যমের সামনে অভিযোগ করেন যে, অনেক জায়গায় দেখা গেছে একটি সাধারণ হোল্ডিং নম্বরে যেখানে বড়জোড় পাঁচ থেকে সাতজন সদস্য থাকার কথা, সেখানে রহস্যজনকভাবে ২০ থেকে ২৫ জন ভোটারের নাম পাওয়া গেছে। এটি কোনোভাবেই স্বাভাবিক ভোটার মাইগ্রেশন হতে পারে না বলে তিনি মনে করেন। দলটির নেতাদের আশঙ্কা, একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল তাদের প্রার্থীদের জয় নিশ্চিত করতে পরিকল্পিতভাবে অনুগত ভোটারদের এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় সরিয়ে নিয়েছে।

এর আগে গত ১৮ জানুয়ারি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও একই সুরে কথা বলেছিলেন। তিনি সরাসরি দাবি করেছিলেন যে, একটি রাজনৈতিক দল তাদের প্রার্থীকে জেতাতে রাজধানী ঢাকায় বাইরের ভোটার স্থানান্তরের ‘কৌশল’ নিয়েছে। তবে বিএনপির এই টানা অভিযোগের বিপরীতে ভিন্ন সুর শোনা গেছে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের মন্তব্য করেছেন যে, জনগণের প্রকৃত সমর্থন কার দিকে আছে তা নিয়ে যারা ভীত, তারাই মূলত এখন এ ধরনের অবান্তর অভিযোগ তুলে নির্বাচনের পরিবেশ ঘোলাটে করতে চাইছে।

এদিকে অভিযোগের পাহাড় জমলেও নির্বাচন কমিশনের হাতে থাকা তথ্য ভিন্ন কথা বলছে। জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এবারের নির্বাচনকে সামনে রেখে সারা দেশে মোট ৮ লাখ ৪ হাজার ভোটার স্থানান্তরের আবেদন জমা পড়েছিল। এর মধ্যে তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে ৭ লাখ ৭১ হাজার ভোটারের আবেদন মঞ্জুর করা হয়েছে এবং তাদের স্থানান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। আঞ্চলিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি ভোটার মাইগ্রেশন হয়েছে কুমিল্লা অঞ্চলে, যার সংখ্যা ১ লাখ ৫ হাজার ৫৪৩ জন। ঢাকা অঞ্চলে এই সংখ্যা ৮৬ হাজার ৮২৫ জন এবং ময়মনসিংহে ৭৮ হাজার ৮০৫ জন। তবে সিলেট অঞ্চলে ভোটার স্থানান্তরের হার সবচেয়ে কম, যা মাত্র ২৭ হাজার ৫৭৬ জন।

ঢাকার আসনগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, ঢাকা-১ আসনে ৪ হাজার ৭৩২ জন এবং আলোচিত ঢাকা-১৮ আসনে ৪ হাজার ৭০ জন নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছেন। এই পরিসংখ্যানকে নির্বাচন কমিশন কোনোভাবেই অস্বাভাবিক বা কৃত্রিম বলতে রাজি নয়। জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক এএসএম হুমায়ুন কবীর স্পষ্ট করেছেন যে, ভোটার স্থানান্তর একটি চলমান প্রক্রিয়া যা সারা বছরই চলে। নাগরিকরা তাদের পেশাগত কারণ, স্থায়ী আবাসন পরিবর্তন বা অন্য কোনো ব্যক্তিগত কারণে এলাকা পরিবর্তন করলে বিধি অনুযায়ী ভোটার এলাকা বদলান। তিনি আরও জানান, গত চার বছরের চিত্র দেখলে দেখা যায় ২০২২ সালে যেখানে ৭ লাখ ১৭ হাজারের বেশি মানুষ ভোটার এলাকা বদলেছিলেন, সেই তুলনায় গত দুই বছরে এই হার মোটেও উদ্বেগজনক নয়।

বিএনপির পক্ষ থেকে দেওয়া অস্বাভাবিক হোল্ডিং নম্বরে অতিরিক্ত ভোটারের অভিযোগের প্রেক্ষিতে কমিশন জানিয়েছে, বিষয়টি তারা গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখছে এবং শীঘ্রই এর একটি যুক্তিনির্ভর ব্যাখ্যা প্রদান করা হবে। কমিশনের কর্মকর্তাদের মতে, ঢাকা শহরের অনেক মেসে বা বহুতল ভবনে একই হোল্ডিংয়ে অনেক মানুষ থাকতে পারেন, যা হয়তো অভিযোগকারীদের মনে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। তবে কোনো জালিয়াতি বা আইন বহির্ভূত কাজ হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে মাঠ পর্যায়ে তদন্তের নির্দেশনা দেওয়া হতে পারে।

সার্বিক এই বিতর্কের মধ্যেই নির্বাচন কমিশন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা ঘোষণা করেছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচনে মোট ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৫ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। পুরুষ ভোটারের সংখ্যা ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজারের বেশি এবং নারী ভোটারের সংখ্যা ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজারের মতো। এছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের ১ হাজার ১২০ জন ভোটার এবার নিজেদের পছন্দের প্রার্থী বেছে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভোটার স্থানান্তর নিয়ে তৈরি হওয়া এই অবিশ্বাস দূর করা ইসির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যদি রাজনৈতিক দলগুলোর মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ থেকে যায়, তবে নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ থেকে যাবে। তাই ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত নতুন সদস্যদের তথ্য স্বচ্ছভাবে প্রকাশের মাধ্যমে এই সংকটের সমাধান করা জরুরি।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে গত চার বছরে মোট ২১ লাখ ১৫ হাজার ৪৫৮ জন মানুষ ভোটার এলাকা পরিবর্তন করেছেন। এর মধ্যে ২০২৪ সালে ৩ লাখ ৭০ হাজার ৯১৭ জন এবং ২০২৩ সালে ৪ লাখ ৬১ হাজার ৫৫৯ জন এই সুযোগ নিয়েছেন। সাধারণত প্রতিবার ভোটার তালিকা হালনাগাদের বছর এই সংখ্যা সবথেকে বেশি থাকে। এবারের নির্বাচনে মোট ভোটারের মধ্যে তরুণ ভোটারদের আধিক্য যেমন একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক, তেমনি ভোটার মাইগ্রেশনের ফলে কুমিল্লা ও ঢাকা অঞ্চলের ফলাফল অনেক আসনে বদলে যেতে পারে। ১০টি প্রশাসনিক অঞ্চলের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, কৃষি ও শিল্প সমৃদ্ধ এলাকাগুলোতে স্থানান্তর বেশি হয়েছে যা সাধারণত কর্মসংস্থানের পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত। ইসির তথ্য মতে, মোট আবেদনের প্রায় ৯৫ শতাংশ আবেদনই যৌক্তিক কারণ থাকায় গৃহীত হয়েছে। বর্তমান তথ্য অনুযায়ী সারা দেশে ভোটারদের একটি বিশাল অংশ অর্থাৎ প্রায় ৫ কোটি নতুন ও মধ্যবয়সী ভোটার রয়েছেন যারা এই নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা পালন করবেন। ভোটার স্থানান্তরের অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে এখন ডিজিটাল ডাটাবেজ ব্যবহার করে ডুপ্লিকেট এন্ট্রি শনাক্ত করার কাজ করছে কমিশন।