এখন সময় ডেস্ক • প্রকাশিত: ০২ মার্চ ২০২৬, ০৮:৪৯ পিএম • অনলাইন সংস্করণ

ভূ-রাজনীতির মহাকাব্যিক দাবার চাল: যেভাবে ‘একঘরে’ হলো তেহরান

ভূ-রাজনীতির মহাকাব্যিক দাবার চাল: যেভাবে ‘একঘরে’ হলো তেহরান

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যখন ইসরায়েলি এফ-৩৫ ফাইটার জেটের গর্জন শোনা যাচ্ছিল, তখন বিশ্ববাসী কেবল তেহরান আর ইসফাহানের বিস্ফোরণগুলোই দেখছিল। কিন্তু এই প্রলয়ঙ্কারী সামরিক অভিযানের আসল যুদ্ধটি শুরু হয়েছিল এর ঠিক ২৪ ঘণ্টা আগে, অনেকটা পর্দার আড়ালে। বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্র এবং এই ঘটনার গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির পতন এবং দেশটির সামরিক স্থাপনাগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়ার নেপথ্যে ছিল এক দীর্ঘমেয়াদী এবং সূক্ষ্ম কূটনৈতিক ‘মাস্টারস্ট্রোক’।

মোদির ইসরায়েল সফর: এক নতুন সমীকরণের সূচনা

গত ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬। বিশ্ব যখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নিয়ে চরম উৎকণ্ঠায়, ঠিক তখনই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইসরায়েলের মাটিতে পা রাখেন। সক্রিয় যুদ্ধ চলাকালীন মোদিই ছিলেন একমাত্র রাষ্ট্রপ্রধান যিনি ইসরায়েল সফর করেছেন। এই সফরটি কেবল দ্বিপাক্ষিক সৌজন্য সাক্ষাৎ ছিল না; বরং এটি ছিল ইতিহাসের অন্যতম বড় এক সামরিক ও কূটনৈতিক ডিল।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ভারতের কাছে দুটি অত্যন্ত সংবেদনশীল আবদার করেছিলেন:

প্রথমত: ইরানের চাবাহার বন্দর এবং ওমানের দুকুম বন্দরে ভারতের যে কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, তা ব্যবহার করে ইসরায়েলকে লজিস্টিক সাপোর্ট এবং রিয়েল-টাইম ইন্টেলিজেন্স সরবরাহ করা।

দ্বিতীয়ত: আফগানিস্তানে তালেবানের ওপর ভারতের ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে পাকিস্তানকে ব্যস্ত রাখা।

তালেবান কার্ড এবং পাকিস্তানের নিষ্ক্রিয়তা

ইতিহাস সাক্ষী, ইরান যখনই বড় কোনো বিপদে পড়েছে, প্রতিবেশী পাকিস্তান সবসময়ই তেহরানকে গোয়েন্দা তথ্য এবং সামরিক ব্যাকআপ দিয়ে সাহায্য করেছে। কিন্তু এবার সেই পথটি অত্যন্ত চতুরতার সাথে বন্ধ করে দেওয়া হয়। ভারতের প্রচ্ছন্ন ইশারায় তালেবান যখন পাকিস্তানের পশ্চিম সীমান্তে একের পর এক হামলা শুরু করে, তখন ইসলামাবাদ তাদের সর্বশক্তি সেই সীমান্তে সরাতে বাধ্য হয়।

এর ফলে যা ঘটেছিল তা ছিল অভূতপূর্ব:

পাকিস্তান তাদের চিরশত্রু তালেবানকে সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

ইরানের প্রতি পাকিস্তানের যে চিরাচরিত সামরিক ও কূটনৈতিক সমর্থন ছিল, তা কার্যত শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।

তেহরান তার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিবেশীর কাছ থেকে কোনো ধরনের সাহায্য পাওয়ার সুযোগ হারায়।

চাবাহার ও দুকুম: ভারতের হাতে থাকা টেকনিক্যাল চাবিকাঠি

ইরানের চাবাহার বন্দরটি ভারতের জন্য কেবল একটি বাণিজ্যিক রুট নয়, এটি এখন ভূ-রাজনীতির অন্যতম প্রধান অস্ত্র। ইসরায়েল এই বন্দর এবং ওমানের দুকুম বন্দরের নিয়ন্ত্রণ ব্যবহারের মাধ্যমে সরাসরি ইরানের সরবরাহ লাইনের ওপর নজরদারি শুরু করে। এর ফলে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী জানত, ইরানি নৌবাহিনী বা আইআরজিসি (IRGC) কোন দিক দিয়ে তাদের পাল্টা আক্রমণ চালাতে পারে।

অস্তিত্বের সংকটে ইরান

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই পরাজয় কেবল সামরিক দুর্বলতা নয়, বরং কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার ফসল। খামেনির সুরক্ষিত বাংকারে ‘বাংকার-বাস্টার’ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত যতটা শক্তিশালী ছিল, তার চেয়েও বেশি শক্তিশালী ছিল ভারতের মাধ্যমে বিছানো এই কূটনৈতিক জাল।

বিশ্লেষণের মূল পয়েন্টগুলো হলো:

১. একতরফা যুদ্ধ: পাকিস্তান ও তালেবানের মধ্যে সীমান্ত সংঘর্ষ তৈরি করে ইসরায়েল নিশ্চিত করেছিল যে ইরান একা লড়বে।

২. ভারত-ইসরায়েল অক্ষ: মোদির এই সফর প্রমাণ করেছে যে দক্ষিণ এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ভারত এখন এক নীরব কিন্তু অত্যন্ত প্রভাবশালী খেলোয়াড়।

৩. গোয়েন্দা তথ্য পাচার: চাবাহার বন্দরের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যগুলো ইসরায়েলের ‘লায়ন’স রোর’ অভিযানকে শতভাগ নিখুঁত করতে সাহায্য করেছে।

ভবিষ্যৎবাণী: কোন দিকে যাচ্ছে বিশ্ব?

খামেনির মৃত্যুর পর ইরানি শাসনব্যবস্থা এখন ছিন্নভিন্ন। তবে এর চেয়েও বড় ভয়ের কারণ হলো বৈশ্বিক মেরুকরণ। রাশিয়া ও চীন এই ঘটনায় ভারতের নীরব সমর্থনকে কীভাবে দেখবে, তা এখন বড় প্রশ্ন। এদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘এপিক ফিউরি’র লক্ষ্য যদি কেবল তেহরান দখলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, তবে এই সংঘাত দক্ষিণ এশিয়াকেও গ্রাস করতে পারে।

মাত্র ২৪ ঘণ্টার একটি নিখুঁত সমন্বিত পরিকল্পনা—মোদির সফর, তালেবান চাপ এবং পাকিস্তানের ব্যস্ততা—পুরো যুদ্ধের ময়দানকে আমূল বদলে দিয়েছে। ইরান এখন কেবল তার অভ্যন্তরীণ শত্রুর সাথেই লড়ছে না, বরং সে লড়ছে এক অদৃশ্য কূটনৈতিক জালের বিরুদ্ধে যা তাকে আক্ষরিক অর্থেই পঙ্গু করে দিয়েছে।