বিশ্ব রাজনীতির গত কয়েক দশকের পরিচিত মেরুকরণ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য বা ‘ইউনিপোলার’ ব্যবস্থার যে প্রভাব ছিল, তা এখন এক বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে। বিশেষ করে বিশ্বের তথাকথিত ‘মধ্যম শক্তি’র দেশগুলো—যেমন যুক্তরাজ্য, কানাডা এবং ফ্রান্স—এখন আর অন্ধভাবে ওয়াশিংটনের নীতি অনুসরণ করতে রাজি নয়। সাম্প্রতিক সময়ে এই দেশগুলোর রাষ্ট্রপ্রধানদের ঘন ঘন বেইজিং সফর এবং চীনের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন ‘প্যারাডাইম শিফট’ বা আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বেইজিংয়ে কিয়ার স্টারমার: আট বছরের অচলাবস্থার অবসান
দীর্ঘ আট বছর পর কোনো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কিয়ার স্টারমার চীন সফরে গিয়েছেন। তার এই সফরটি এমন এক সময়ে ঘটছে যখন ব্রেক্সিট-পরবর্তী যুক্তরাজ্য তার ধুঁকতে থাকা অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে মরিয়া। ৬০ জন ব্যবসায়িক প্রতিনিধির একটি বিশাল দল নিয়ে স্টারমারের এই বেইজিং সফর প্রমাণ করে যে, নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ থাকলেও অর্থনৈতিক প্রয়োজনে চীনের সাথে হাত মেলানো এখন লন্ডনের জন্য অপরিহার্য।
বিগত বছরগুলোতে হংকং ইস্যু, উইঘুর মুসলিমদের ওপর দমন-পীড়ন এবং গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে লন্ডন ও বেইজিংয়ের সম্পর্ক ছিল তলানিতে। কিন্তু বর্তমান সরকার সেই ‘বরফ শীতল’ সম্পর্ক ভাঙতে আগ্রহী। সফরের ঠিক কয়েক সপ্তাহ আগে লন্ডন সিটির প্রাণকেন্দ্রে চীনের একটি বিশাল ‘মেগা অ্যাম্বাসি’ বা দূতাবাস নির্মাণের অনুমতি দিয়েছে ব্রিটিশ সরকার। যদিও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সতর্ক করেছিল যে, এই দূতাবাসের অবস্থান সংবেদনশীল আর্থিক অবকাঠামোর খুব কাছে হওয়ায় জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি হতে পারে, তবুও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে ব্রিটেন এই ঝুঁকি গ্রহণ করেছে।
কানাডা ও ফ্রান্সের বেইজিং যাত্রা: ওয়াশিংটনের জন্য সতর্কবার্তা
শুধু ব্রিটেন নয়, কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এবং ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁও বেইজিংয়ের সাথে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু করেছেন। বিশেষ করে কানাডার ক্ষেত্রে এই পরিবর্তনটি বেশ চমকপ্রদ। এর আগে মার্কিন শুল্ক নীতির বিরুদ্ধে এক প্রকার প্রতিবাদ হিসেবেই কার্নি চীনের সাথে সরাসরি বাণিজ্যের পথে হাঁটেন। অন্যদিকে, ম্যাক্রোঁ বারবারই ইউরোপের ‘স্ট্র্যাটেজিক অটোনোমি’ বা কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের কথা বলছেন, যার অর্থ হলো ইউরোপ তার নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেবে, ওয়াশিংটনের প্রভাবে থাকবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি এবং তার লেনদেনভিত্তিক (transactional) পররাষ্ট্রনীতি মিত্র দেশগুলোকে ভাবিয়ে তুলেছে। গ্রিনল্যান্ড দখল করার ইচ্ছা পোষণ বা মিত্রদের ওপর হুটহাট শুল্ক আরোপ করার মতো ঘটনাগুলো কানাডা ও ইউরোপীয় দেশগুলোকে বিকল্প বাজারের সন্ধানে বাধ্য করছে।
অর্থনীতির জন্য বেইজিং, প্রতিরক্ষায় ওয়াশিংটন: এক ঝুঁকিপূর্ণ ভারসাম্য
এই মধ্যম শক্তির দেশগুলো বর্তমানে একটি দ্বি-মুখী নীতি গ্রহণ করেছে। তাদের মূলমন্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে: ‘ব্যবসা চীনের সাথে, আর প্রতিরক্ষা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে’। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এই ভারসাম্য কতদিন ধরে রাখা সম্ভব?
চীন বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। বিশেষ করে গ্রিন টেকনোলজি, ইলেকট্রিক ভেহিকল (EV) এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) ক্ষেত্রে চীন এখন বিশ্বনেতা। অ্যাস্ট্রাজেনেকার মতো ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো চীনে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। তারা তাদের গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) কেন্দ্রগুলোও ব্রিটেনে না রেখে চীনের দিকে সরিয়ে নিচ্ছে। এর কারণ হলো চীনের বিশাল বাজার এবং উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থা।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। যদিও দেশগুলো চীনের দিকে ঝুঁকছে, তবুও নিরাপত্তার প্রশ্নে তারা এখনো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। ন্যাটোর সদস্য হিসেবে এবং দীর্ঘদিনের সামরিক মিত্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কাটিয়ে ওঠা এত সহজ নয়। ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই কিয়ার স্টারমার এবং মার্ক কার্নির বেইজিং সফর নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে।
বেইজিংয়ের দৃষ্টিভঙ্গি: মাল্টিপোলার বা বহুমেরু বিশ্বের উদয়
চীনের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিশ্ব এখন আর একক কোনো দেশের নিয়ন্ত্রণে নেই। বেইজিংয়ের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এখন নিজের অভ্যন্তরীণ সমস্যায় জর্জরিত এবং তারা বিশ্ব নেতৃত্ব থেকে ক্রমশ পিছিয়ে আসছে। অন্যদিকে, চীন নিজেদের একটি ‘স্থিতিশীল অংশীদার’ হিসেবে তুলে ধরছে। চীন কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে (যেমন জাতিসংঘ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা) সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মিত্র দেশগুলোকে আকৃষ্ট করছে।
বেইজিংয়ের দাবি, তারা কোনো দেশকে আক্রমণ করে না বা কারো জলসীমায় অবৈধভাবে যুদ্ধজাহাজ পাঠায় না, তাই ইউরোপ বা কানাডার জন্য চীন কোনো সামরিক হুমকি নয়। এই ন্যারেটিভটি মধ্যম শক্তির দেশগুলোর কাছে বেশ গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে, যারা যুদ্ধের চেয়ে বাণিজ্যকেই এখন বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে।
উত্তরণের পথ ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
তবে এই রূপান্তর মোটেও মসৃণ নয়। দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং জাপানের মতো দেশগুলোও এখন চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু চীনের অভ্যন্তরীণ বাজার এখনো বিদেশি কোম্পানিগুলোর জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত নয়। চীনে ব্যবসার মুনাফা কমে আসা এবং ঘরোয়া কোম্পানিগুলোর সাথে তীব্র প্রতিযোগিতা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
আবার আমেরিকার বাজার এখনো ইউরোপ ও কানাডার জন্য সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্য। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দীর্ঘ ৭০ বছরের অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক ছিন্ন করা শুধু কঠিনই নয়, অনেক ক্ষেত্রে অসম্ভব। তাই বর্তমানের এই বেইজিংমুখী দৌড়কে অনেকেই ‘হেজিং’ বা ঝুঁকি কমানোর কৌশল হিসেবে দেখছেন। অর্থাৎ, ট্রাম্পের অনিশ্চিত নীতি থেকে বাঁচতে দেশগুলো বেইজিংয়ের সাথে একটি বিকল্প পথ তৈরি করে রাখছে।
বিশ্ব রাজনীতি এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে ওয়াশিংটনের ঐতিহ্যগত প্রভাব, অন্যদিকে বেইজিংয়ের উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি। মধ্যম শক্তির দেশগুলো এখন আর কারো ‘পুতুল’ হয়ে থাকতে চায় না। তারা তাদের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিচ্ছে। কিয়ার স্টারমার বা মার্ক কার্নির বেইজিং সফর কেবল কিছু বাণিজ্যিক চুক্তি নয়, বরং এটি একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থার বার্তা দিচ্ছে যেখানে শক্তি এখন আর এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত নয়। আগামী কয়েক বছর নির্ধারণ করবে এই দেশগুলো শেষ পর্যন্ত কার পাশে দাঁড়াবে, নাকি তারা নিজেরাই এক নতুন শক্তির মেরু হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।