প্রকাশিত: ২৯ ডিসেম্বার ২০২৫, ০৭:৪৬ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

ভারতীয় গণমাধ্যমে বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণা ও বর্তমান কূটনৈতিক সংকটের নেপথ্যে

ভারতীয় গণমাধ্যমে বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণা ও বর্তমান কূটনৈতিক সংকটের নেপথ্যে

সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে এক নজিরবিহীন নেতিবাচক প্রচারণা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং বিচ্ছিন্ন কিছু সহিংস ঘটনাকে ভিত্তি করে একতরফা সংবাদ প্রচারের মাধ্যমে দেশটিকে একটি অস্থিতিশীল ও সংখ্যালঘু-বিদ্বেষী রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বদরবারে চিত্রিত করার চেষ্টা করছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো। এই প্রচারণা কেবল সাংবাদিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের মূলে আঘাত করছে।

পশ্চিমবঙ্গের মালদহ, কোচবিহার ও শিলিগুড়ি জেলার হোটেল মালিকদের সংগঠন ঘোষণা করেছে যে বাংলাদেশি নাগরিকদের আর তাদের হোটেলে থাকার অনুমতি দেওয়া হবে না। হোটেলের সামনে বাংলাদেশিদের প্রবেশ নিষেধ নোটিশ টাঙানো হয়েছে, যা ভারতীয় গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। বাস্তবে এটি কোনো ভারতীয় সরকারি সিদ্ধান্ত নয়, বরং কিছু বেসরকারি সংগঠনের রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত অবস্থান। এর ফলে চিকিৎসা, শিক্ষা ও মানবিক কারণে ভারতে আসা বাংলাদেশিরাও চরম ভোগান্তির মুখে পড়ছেন।

বাংলাদেশে সংঘটিত কয়েকটি বিচ্ছিন্ন হত্যাকাণ্ড ও সহিংস ঘটনাকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে হিন্দু নিধন বা ধর্মীয় গণহত্যা হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। অথচ বাস্তবে এগুলো পৃথক পৃথক ফৌজদারি অপরাধ, যেগুলোর তদন্ত চলছে এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এমনকি ফরিদপুরে জেমসের কনসার্ট বাতিলের মতো প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকেও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার ওপর মৌলবাদী আক্রমণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এই ধরনের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ পরিবেশন বাস্তবতাকে অতিরঞ্জিত করে একটি নির্দিষ্ট বয়ান তৈরির ইঙ্গিত দেয়।

পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সভাপতি শুভেন্দু অধিকারী প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছেন যে জানুয়ারিতে পাঁচ লক্ষ হিন্দু সাধু নিয়ে বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশনে অভিযান চালাবেন। ভারতীয় গণমাধ্যমের একটি বড় অংশ এই ধরনের আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনকারী বক্তব্যকে কঠোর সমালোচনা না করে বরং ন্যায্য প্রতিবাদ হিসেবে প্রচার করছে, যা সরাসরি দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনাকে উসকে দিচ্ছে। পাশাপাশি ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশকে একটি অস্থিতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে চিত্রিত করার প্রবণতাও স্পষ্ট।

পর্যটন ও চিকিৎসা খাতের ক্ষেত্রে হোটেল বয়কট এবং ভিসা জটিলতার ফলে ভারতে চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগীরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি বাংলাদেশের পর্যটন খাত নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হওয়ায় বিদেশি পর্যটকদের আগমনে ভাটা পড়তে পারে। ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্যের সিংহভাগই পশ্চিমবঙ্গের স্থলবন্দরের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় চলমান উত্তেজনায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেতে পারে। এছাড়া আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করার এই চেষ্টা জিএসপি সুবিধা বা বিদেশি বিনিয়োগের জন্য হুমকির কারণ হতে পারে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশকে তথ্যনির্ভর ও কূটনৈতিকভাবে বলিষ্ঠ অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি ডেডিকেটেড সেল গঠন করা উচিত যা আন্তর্জাতিক মিডিয়ার কাছে ভুলগুলো ধরিয়ে দেবে। এছাড়া নিয়মিতভাবে বিদেশি দূতাবাস ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে নিয়ে ব্রিফিং করা এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তায় সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের ওপর একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা জরুরি। চিকিৎসা ও পর্যটনের জন্য এককভাবে ভারতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নেপাল, থাইল্যান্ড এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সাথে ট্রাভেল কানেক্টিভিটি বাড়ানোও একটি কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে।

ভারতের বর্তমান নেতিবাচক প্রচারণার প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে। বাংলাদেশকে এই পরিস্থিতিতে আবেগী প্রতিক্রিয়ার পথে না গিয়ে ধৈর্যশীল এবং বলিষ্ঠ কূটনৈতিক অবস্থান বজায় রাখতে হবে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতিই এই সংকট উত্তরণের একমাত্র পথ।