বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৪তম গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ব্যবসায়ী নেতা মো. মোস্তাকুর রহমান। তবে দেশের ইতিহাসে প্রথম কোনো ব্যবসায়ীকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ পদে বসানোর এই সিদ্ধান্তকে ‘জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী’ ও ‘স্বার্থের দ্বন্দ্ব’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, একজন তৈরি পোশাকশিল্প ও আবাসন ব্যবসায়ী হিসেবে মোস্তাকুর রহমান করপোরেট ও লবিস্ট মহলের প্রভাবমুক্ত হয়ে কতটা নির্মোহভাবে আর্থিক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে পারবেন, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ রয়েছে।
ব্যবসায়ী যখন ব্যাংকের নিয়ন্ত্রক
টিআইবি তাদের বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে যে, নতুন গভর্নরের অভিজ্ঞতা মূলত ঋণগ্রস্ত হওয়া এবং বিশেষ বিবেচনায় নিজের প্রতিষ্ঠানের ঋণ পুনঃতফসিল করার প্রক্রিয়াসংক্রান্ত। তৈরি পোশাকশিল্প, রিহ্যাব ও ঢাকা চেম্বারের মতো প্রভাবশালী ব্যবসায়ী সংগঠনের অংশ হিসেবে তার দীর্ঘ পথচলা থাকলেও ব্যাংক খাতের তদারকি বা নিয়ন্ত্রক হিসেবে তার সক্ষমতা প্রশ্নাতীত নয়।
সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, "কর্তৃত্ববাদী চৌর্যতন্ত্রের আমলে খাদে পড়া ব্যাংক খাতকে পুনরুদ্ধারের জন্য এমন একজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যার নিজেরই বিশেষ বিবেচনায় ঋণ পুনঃতফসিলের অভিজ্ঞতা রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, তিনি ঋণখেলাপি ও ব্যবসায়ী লবির প্রভাবমুক্ত থেকে কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন?"
নির্বাচনী ইশতেহার ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা
টিআইবি আরও মনে করিয়ে দেয় যে, সদ্য ক্ষমতাসীন দল বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ব্যাংক খাতের সুশাসন ও তদারকি নিশ্চিতের অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু নির্বাচন পরিচালনা কমিটির একজন সদস্যকে গভর্নর নিয়োগ দেওয়া সেই অঙ্গীকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
বিবৃতিতে বলা হয়, বর্তমান সংসদে প্রায় ৬০ শতাংশ এবং মন্ত্রিপরিষদের ৬২ শতাংশ সদস্যই ব্যবসায়ী। এমন একটি ব্যাবসায়িক প্রভাবপুষ্ট রাষ্ট্রকাঠামোতে একজন ব্যবসায়ীকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চাবিকাঠি দেওয়া মানে হলো ব্যাংক খাতকে আবারও স্বার্থান্বেষী মহলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ করে দেওয়া।
আন্তর্জাতিক বার্তা ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি
চলমান অর্থনৈতিক সংকটে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ যখন প্রধান চ্যালেঞ্জ, তখন এই বিতর্কিত নিয়োগ আন্তর্জাতিকভাবে নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে বলে মনে করে টিআইবি। ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, "ব্যক্তিস্বার্থ ও দুর্বল ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে তিনি আদৌ স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন কি না, সে বিষয়ে বড় ধরনের সন্দেহ রয়েছে।"
বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৪তম গভর্নর হিসেবে মো. মোস্তাকুর রহমানের নিয়োগ দেশের আর্থিক খাতের ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন ও বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। সাধারণত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ পদে দক্ষ অর্থনীতিবিদ বা পেশাদার আমলাদের নিয়োগ দেওয়ার দীর্ঘদিনের রীতি ভেঙে এবার একজন সক্রিয় ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে বেছে নেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তটি ‘চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান’ পরবর্তী স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জনআকাঙ্ক্ষার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
এই নিয়োগের গভীরতর নেতিবাচক প্রভাবটি মূলত ‘স্বার্থের সংঘাত’ (Conflict of Interest)-এর মধ্যে নিহিত। নতুন গভর্নর নিজে এমন সব খাতের প্রতিনিধিত্ব করছেন, যারা দেশের ব্যাংক ঋণের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী। যখন নিয়ন্ত্রক সংস্থা নিজেই সুবিধাভোগী শ্রেণির প্রতিনিধি হয়ে ওঠে, তখন সাধারণ আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং ব্যাংক খাতে কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এটি প্রকারান্তরে ‘নীতি দখল’ বা পলিসি ক্যাপচারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়, যেখানে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী লবি নিজেদের সুবিধামতো আর্থিক আইন ও ঋণের নিয়মাবলী পরিবর্তনের সুযোগ পেতে পারে।
পাশাপাশি, বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের জায়গাতেও এই নিয়োগ বড় ধরণের প্রশ্ন তুলেছে। নির্বাচন পরিচালনা কমিটির একজন সদস্যকে গভর্নরের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনকে চরমভাবে ক্ষুন্ন করা হয়েছে। এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আবারও রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার পুরনো সংস্কৃতিতে ফিরে যাওয়ার পথে রয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সার্বিকভাবে, বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনীতিকে টেনে তুলতে যেখানে একজন কঠোর ও নির্মোহ প্রশাসকের প্রয়োজন ছিল, সেখানে মোস্তাকুর রহমানের নিয়োগ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে এক নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। এখন বড় প্রশ্ন হলো—নতুন গভর্নর কি তার ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক পরিচয় ছাপিয়ে জাতীয় স্বার্থে নিরপেক্ষ থাকতে পারবেন, নাকি ব্যাংক খাত আবারও সেই পুরনো ‘চৌর্যতন্ত্রের’ চক্রে আবর্তিত হবে?