ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে না বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর。 ভারতের জনপ্রিয় সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন ‘দ্য উইক’-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, শেখ হাসিনা এই সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো স্থায়ী বাধা নন এবং তাকে ছাড়াই দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া সম্ভব。
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের নতুন রূপরেখা
সাক্ষাৎকারে মির্জা ফখরুল দুই দেশের অমীমাংসিত সমস্যাগুলো সমাধানে ভারতের প্রতি আন্তরিক হওয়ার আহ্বান জানান。 তিনি বলেন, সার্বভৌমত্ব, আত্মসম্মান ও পারস্পরিক বিশ্বাসের ভিত্তিতে দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে বিদ্যমান সংকটগুলো কাটিয়ে ওঠা জরুরি。 তার মতে, সম্পর্কের উন্নয়নের জন্য কয়েকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:
পানি বণ্টন: দীর্ঘদিনের তিস্তা চুক্তিসহ অন্যান্য অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন ইস্যুতে কেবল আলোচনা নয়, কার্যকর ও আন্তরিক সমাধান প্রয়োজন。
সীমান্ত হত্যা: সীমান্তে বাংলাদেশিদের প্রাণহানি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং এটি অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
বাণিজ্য বৈষম্য: দুই দেশের বাণিজ্যে বিদ্যমান অসমতা দূর করে ন্যায্য বাণিজ্য পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
ক্রিকেট বিতর্ক: সম্প্রতি ক্রিকেটকে কেন্দ্র করে যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, তাকে তিনি 'অপ্রয়োজনীয়' বলে আখ্যা দেন。
মির্জা ফখরুল আরও জানান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শোকের সময় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের বাংলাদেশ সফরকে বিএনপি ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে।
রাজনীতি ও নির্বাচনি জোটের সমীকরণ
আসন্ন নির্বাচনে জোট গঠন ও আসন বণ্টন নিয়ে মির্জা ফখরুল গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করেন:
ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (NCP): ছাত্রদের উদ্যোগে গঠিত এনসিপির সঙ্গে জোট না হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি আসন বণ্টন নিয়ে অসমঝোতাকে দায়ী করেন。 দলটির পক্ষ থেকে অতিরিক্ত আসন দাবি করায় শেষ পর্যন্ত ঐক্য সম্ভব হয়নি।
জামায়াতে ইসলামী: নির্বাচনি জোটে জামায়াতের থাকা নিয়ে তিনি সরাসরি 'না' বলে দেন。 তিনি স্পষ্ট করেন যে, সরকার গঠিত হলে কেবল আন্দোলনের সঙ্গীদের নিয়ে 'জাতীয় ঐকমত্যের সরকার' হবে, যেখানে জামায়াতের অন্তর্ভুক্তির সুযোগ নেই।
পাকিস্তানের প্রতি অবস্থান: ১৯৭১ সালের গণহত্যার জন্য পাকিস্তানকে অবশ্যই ক্ষমা চাইতে হবে—এটিই বিএনপির অনড় অবস্থান।
৩১ দফা সংস্কার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঘোষিত ‘৩১ দফা’ সংস্কার কর্মসূচি তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে বলে দাবি করেন মির্জা ফখরুল। তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মূল স্তম্ভগুলো হলো:
প্রধানমন্ত্রীর পদের মেয়াদ সর্বোচ্চ দুই মেয়াদে সীমাবদ্ধ করা।
বিচার বিভাগ ও গণমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
মাত্র ১৮ মাসের মধ্যে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।
বিএনপির কৌশলী কূটনীতি ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এই সাক্ষাৎকারটি দলটির বর্তমান রাজনৈতিক দর্শনের এক প্রতিচ্ছবি। এর উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো:
১. ভারতের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন (Shift in Diplomacy): বিএনপি প্রথাগতভাবে 'ভারত-বিদ্বেষী' তকমা ঝেড়ে ফেলে একটি আধুনিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের দিকে ঝুঁকছে। শেখ হাসিনাকে 'ফ্যাক্টর' মানলেও তাকে সম্পর্কের মূল ভিত্তি না ধরা ভারতের নীতিনির্ধারকদের প্রতি একটি পরোক্ষ বার্তা যে, বিএনপি ভারতের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত。
২. তারুণ্য ও সংস্কারের রাজনীতি: ৩১ দফার মাধ্যমে বিএনপি শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত তরুণ সমাজকে কাছে টানতে চাইছে। প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমাবদ্ধ করার ঘোষণাটি মূলত দেশে 'একনায়কতন্ত্র' রোধের একটি প্রতিশ্রুতি হিসেবে দেখা হচ্ছে。
৩. জামায়াত থেকে দূরত্ব বজায় রাখা: নির্বাচনি বৈতরণী পার হতে জামায়াতকে সাথে না নেওয়া এবং 'জাতীয় ঐকমত্যের সরকার'-এর ধারণাটি মূলত ভারত ও পশ্চিমা বিশ্বের সমর্থন আদায়ের একটি কৌশল হতে পারে。 এটি ডেমোক্র্যাট বা মডারেট ভোটারদের কাছেও ইতিবাচক বার্তা দেবে।
৪. অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি: দেড় বছরে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতিটি অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী。 তবে এটি নির্বাচনি ইশতেহারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে এবং সাধারণ ভোটারদের প্রত্যাশাকে উসকে দেবে。
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যে এটি স্পষ্ট যে, বিএনপি আগামী নির্বাচনে কেবল জয় নয়, বরং রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো সংস্কারের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে。 ভারত ইস্যু থেকে শুরু করে অভ্যন্তরীণ জোট—সব ক্ষেত্রেই দলটি এখন অনেক বেশি বাস্তববাদী অবস্থান নিচ্ছে।