ঢাকা অফিস • প্রকাশিত: ০৩ জানুয়ারী ২০২৬, ০৭:১৫ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণে একটি যুগের অবসান: সংকটে ও সম্ভাবনায় বিএনপি

বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণে একটি যুগের অবসান: সংকটে ও সম্ভাবনায় বিএনপি

রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে গত মঙ্গলবার তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) দীর্ঘদিনের কাণ্ডারি বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণে সারা দেশে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। গত ২৩ নভেম্বর থেকে চিকিৎসাধীন এই নেত্রীর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই হাসপাতালের সামনে ভিড় জমান হাজারো নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ। বুধবার ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে তার জানাজায় লাখো মানুষের ঢল নামে, যেখানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও বিদেশি কূটনীতিকরা উপস্থিত ছিলেন। এই জনসমুদ্রই প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার প্রভাব কতটা গভীর ছিল।

তবে এই শোকের ছায়া ছাপিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে এখন বড় আলোচনা শুরু হয়েছে বিএনপির ভবিষ্যৎ নিয়ে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এমন একটি সংকটময় সময়ে দলের ঐক্যের প্রতীক খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতি বিএনপিকে এক কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছে। দীর্ঘ ১৭ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটি এখন পুরোপুরি পোস্ট-খালেদা যুগে প্রবেশ করল। দলের যাবতীয় কর্তৃত্ব ও দায়বদ্ধতা এখন তার ছেলে ও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ওপর বর্তাচ্ছে।

তারেক রহমানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন আল জাজিরাকে বলেন, বাংলাদেশ একজন সত্যিকারের অভিভাবককে হারিয়েছে। তিনি মনে করেন, খালেদা জিয়া ছিলেন সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রের প্রতীক। বিএনপি তার এই উত্তরাধিকারকে ধারণ করেই আগামী দিনের শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করবে যেখানে আইনের শাসন ও বাকস্বাধীনতা প্রাধান্য পাবে। অন্যদিকে বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমেদের মতে, খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত ক্যারিশমা দলটিকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে বড় ভূমিকা পালন করত। এখন তারেক রহমানকে মাঠের রাজনীতিতে নিজের নেতৃত্বের প্রমাণ দিতে হবে, যা এখনো পুরোপুরি পরীক্ষিত নয়।

এবারের নির্বাচনের প্রেক্ষাপট বিএনপির জন্য অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। গত তিন দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি ছিল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যকার দ্বিমুখী লড়াই। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় মাঠ এখন বহুমাত্রিক। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট এবং জুলাই আন্দোলনের ছাত্রনেতাদের নিয়ে গঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি এখন শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দ্বিমুখী আধিপত্যের রাজনীতি এখন ভেঙে পড়েছে, যা বিএনপির জন্য জয়ের পথ কঠিন করে তুলতে পারে।

রাজনীতি বিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী মনে করেন, তারেক রহমানের দেশে ফিরে আসা দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিভাজন কমিয়ে দিয়েছে। ২০০৮ সাল থেকে প্রবাসে থাকা তারেক রহমান গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন। তার সাম্প্রতিক বক্তব্যে জাতীয়তাবাদ এবং স্বৈরাচারবিরোধী অবস্থানের কারণে তৃণমূল কর্মীরা আশাবাদী হয়ে উঠেছেন। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও দাবি করেছেন যে, তারেক রহমানের নেতৃত্ব নিয়ে দলের ভেতর কোনো সন্দেহ নেই এবং তিনি দলকে এগিয়ে নিতে সক্ষম।

তবে উত্তরাধিকারের পাশাপাশি তারেক রহমানের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হবে দলের শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করা। তৃণমূল পর্যায়ে অনেক নেতাকর্মী মনে করেন, জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক লিগ্যাসি রক্ষা করতে না পারলে মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে। রাজনৈতিক বোদ্ধাদের মতে, আগামী নির্বাচনই নির্ধারণ করবে তারেক রহমান তার বাবা ও মায়ের রেখে যাওয়া রাজনৈতিক উত্তরাধিকার সফলভাবে বয়ে নিতে পারবেন কি না।