বেকারত্বের হার বেড়ে যাওয়া ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড) চলতি বছরে দ্বিতীয়বারের মতো সুদের হার কমিয়েছে। তবে আগামী ডিসেম্বরের বৈঠকে আবারও সুদের হার কমানো “অবশ্যই হবে” এমন নিশ্চয়তা দেননি ফেডের চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েল। তিনি জানিয়েছেন, নীতি-নির্ধারকদের মধ্যে ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ নিয়ে “তীব্র মতপার্থক্য” রয়েছে।
সর্বশেষ বৈঠকে ফেড কর্মকর্তারা সুদের হার এক চতুর্থাংশ পয়েন্ট কমিয়ে ৩.৭৫ থেকে ৪ শতাংশের মধ্যে নির্ধারণ করেছেন—যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এই সিদ্ধান্তে দুটি ভিন্নমত দেখা যায়: ফেড গভর্নর স্টিফেন মিরান আরও বড়, অর্থাৎ অর্ধ-পয়েন্ট কাটছাঁটের পক্ষে ছিলেন; আর কানসাস সিটি ফেড প্রেসিডেন্ট জেফ্রি শমিড বর্তমান হার অপরিবর্তিত রাখার প্রস্তাব দেন।
২০১৯ সালের পর এটাই প্রথমবার ফেডের বৈঠকে বিপরীতমুখী দু’টি ভিন্নমত একসঙ্গে উঠে এলো—যা নির্দেশ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য, অভিবাসন ও সরকারি ব্যয়নীতি নিয়ে ফেড কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক চলছে।
আরও জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে কারণ এবারই প্রথম আধুনিক সময়ে ফেডকে সম্পূর্ণ একটি মাসের সরকারি কর্মসংস্থান তথ্য ছাড়াই নীতি নির্ধারণ করতে হলো। আগস্ট পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধি ছিল ২০১০ সালের পর সবচেয়ে দুর্বল পর্যায়ে। এরই মধ্যে অ্যামাজন ও টার্গেটসহ বড় বড় কোম্পানি হাজার হাজার ছাঁটাই ঘোষণা করেছে।
তবে দীর্ঘমেয়াদি সরকারি শাটডাউন ভবিষ্যতে সুদের হার কমানোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কিছু কর্মকর্তা, বিশেষত শমিডের মতো যারা এখনো মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে উদ্বিগ্ন।
পাওয়েল এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “যখন আপনি কুয়াশায় গাড়ি চালান, তখন আপনি গতি কমান।”
পাওয়েল স্বীকার করেছেন, সরকারি তথ্য ছাড়া অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র ফেডের হাতে নেই। ফেডের সর্বশেষ নীতিবিবৃতিতে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক কিছু সূচক আগের দুর্বল কর্মসংস্থানের তথ্যের সঙ্গে “সামঞ্জস্যপূর্ণ”, তবে উল্লেখযোগ্য কোনো অবনতির ইঙ্গিত নেই।
পাওয়েল বলেন, “গত চার সপ্তাহে কোনো বড় পরিবর্তন ঘটেনি। কর্মসংস্থান বা অর্থনীতির অন্য কোনো খাতেও বড় পতনের ইঙ্গিত নেই।”
বেসরকারি সফটওয়্যার কোম্পানি এডিপি (ADP)–র সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে নিয়োগ কিছুটা বেড়েছে, তবে তা এখনো দুর্বল। তিনি আরও বলেন, ব্যক্তিগত তথ্য সরকারি পরিসংখ্যানের বিকল্প নয়, কারণ সরকারি তথ্যই “বিশ্ব অর্থনীতির স্বর্ণমান” হিসেবে বিবেচিত।
পাওয়েল জানান, নতুন শুল্ক আরোপের পরও মুদ্রাস্ফীতি আপাতত নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, কারণ ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত খরচ ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে না দিয়ে তা নিজেদের মধ্যে সামলে নিচ্ছেন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “শুল্কের প্রভাব সরবরাহ শৃঙ্খল পেরিয়ে ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগে, তাই সামনের দিকে কিছুটা মূল্যবৃদ্ধি দেখা দিতে পারে।”
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন শুল্ক বাস্তবায়িত হলে পণ্যদ্রব্যের দাম আরও বাড়তে পারে। গত সপ্তাহে প্রকাশিত ভোক্তা মূল্যসূচক (CPI) প্রত্যাশার চেয়ে কম হলেও সেখানে মূল্যচাপের ইঙ্গিত রয়ে গেছে—যা ট্রাম্পের শুল্ক নীতির কারণে আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
এদিকে ট্রাম্প দক্ষিণ কোরিয়ায় চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং–এর সঙ্গে বৈঠকে বসেছেন, যেখানে সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র–চীন বাণিজ্য চুক্তি নিয়েও আলোচনা হবে বলে জানা গেছে।
পাওয়েল বলেন, শুল্কজনিত মুদ্রাস্ফীতি “এককালীন প্রভাব” হতে পারে এবং তা দীর্ঘস্থায়ী হবে না—এমনই আশা ফেড কর্মকর্তাদের। তবে অক্টোবরে নির্ধারিত নতুন CPI প্রতিবেদন যদি শাটডাউনের কারণে প্রকাশ না হয়, তাহলে এই অনুমান নিশ্চিত করা কঠিন হবে।
একই সঙ্গে নীতি-নির্ধারকেরা ঘোষণা দিয়েছেন যে, ডিসেম্বরের ১ তারিখের মধ্যে ফেডের ব্যালান্স শিট ছোট করার তিন বছরের পরিকল্পনা শেষ হবে।
মহামন্দা ও কোভিড-১৯ মহামারির সময় অর্থনীতিতে উদ্দীপনা যোগাতে ফেডের ব্যালান্স শিট একসময় ৯ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, যা এখন কমে প্রায় ৬.৬ ট্রিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। সুদের হার নীতির পাশাপাশি এটি অর্থনীতিকে প্রভাবিত করার ফেডের আরেকটি প্রধান হাতিয়ার।
তথ্যসূত্র: সিএনএন