এখন সময় ডেস্ক • প্রকাশিত: ১৯ নভেম্বার ২০২৫, ০১:৪৫ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

বিশ্বজুড়ে যেসব দেশে মৃত্যুদণ্ড এখনো বলবৎ আছে

বিশ্বজুড়ে যেসব দেশে মৃত্যুদণ্ড এখনো বলবৎ আছে

বিশ্বে মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার সামগ্রিকভাবে কমলেও এখনও অন্তত ৫৫টি দেশ এ শাস্তি বহাল রেখেছে। এর বিপরীতে মানবাধিকার ও বিচারব্যবস্থার আধুনিকায়নের যুক্তিতে ১১২টি দেশ মৃত্যুদণ্ড পুরোপুরি বা কার্যত বাতিল করেছে। তবুও কয়েকটি দেশ নিয়মিতভাবে এই শাস্তি কার্যকর করছে এবং নতুন পদ্ধতিও ব্যবহার করছে।

যুক্তরাষ্ট্রে গত বছরের জানুয়ারিতে নাইট্রোজেন গ্যাস ব্যবহার করে এক খুনির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়, যা দেশটিতে এ ধরনের প্রথম ঘটনা। অন্যদিকে জাপানে অগ্নিসংযোগে ৩৬ জনকে হত্যার দায়ে একজনকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানসহ তিনজনকে দণ্ডিত করেছে—এর মধ্যে প্রথম দুইজনের মৃত্যুদণ্ড এবং সাবেক পুলিশের মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন পাঁচ বছরের কারাদণ্ড পেয়েছেন।

বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে মাত্র ৯টি দেশ ‘সবচেয়ে গুরুতর’ অপরাধে নিয়মিতভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে। আরও ২৩টি দেশে আইনগতভাবে মৃত্যুদণ্ড থাকলেও গত দশকে তা কার্যকর হয়নি। ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউয়ের ২০২৫ সালের তালিকায় মৃত্যুদণ্ড বৈধ—এমন ৫৫টি দেশ রয়েছে, যাদের মধ্যে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, সৌদি আরব, ইরান, ইন্দোনেশিয়া, উত্তর কোরিয়া ও সিরিয়া উল্লেখযোগ্য। আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া, ক্যারিবীয় অঞ্চল ও লাতিন আমেরিকার আরও বহু দেশ একই তালিকায় রয়েছে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের হিসাব অনুযায়ী, চীন বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে; সঠিক সংখ্যা গোপন রাখা হলেও তা প্রতিবছর হাজারের বেশি বলে ধারণা করা হয়। চীন বাদে ২০২২ সালে বিশ্বে ৮৮৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে, যা ২০১৭ সালের পর সর্বোচ্চ। একই বছরে অন্তত ২ হাজার ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং ২৮ হাজারের বেশি মানুষ কারাগারে মৃত্যুদণ্ডের অপেক্ষায় ছিলেন। অনেক বন্দী বছরের পর বছর—কখনো দশক ধরে—কনডেমড সেলে কাটান।

যে দেশগুলো নিয়মিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে, তাদের মধ্যে রয়েছে চীন, ইরান, সৌদি আরব, মিসর, যুক্তরাষ্ট্র, ইরাক, ভিয়েতনাম ও ইয়েমেন। সৌদি আরব ২০২২ সালে তিন দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে। ওই বছরই কয়েকটি দেশে দীর্ঘ বিরতির পর আবার মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

সবচেয়ে বেশি মৃত্যুদণ্ড হয় মাদক–সম্পর্কিত অপরাধে। ২০২২ সালে এই ধরনের অপরাধে ৩২৫ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়—এর মধ্যে ২৫৫ জন ইরানে, ৫৭ জন সৌদি আরবে ও ১১ জন সিঙ্গাপুরে। সিঙ্গাপুর ২০২৩ সালে প্রায় দুই দশক পর প্রথমবারের মতো একজন নারীকে ফাঁসি দেয় হেরোইন পাচারের অভিযোগে।

অন্যদিকে মৃত্যুদণ্ড বাতিলের ধারা দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে। ২০২২ সালে ১১২টি দেশে কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়নি। কাজাখস্তান, পাপুয়া নিউগিনি, সিয়েরা লিওন ও মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্র সম্পূর্ণভাবে মৃত্যুদণ্ড তুলে দিয়েছে। মালয়েশিয়া বাধ্যতামূলক মৃত্যুদণ্ড বাতিল করেছে এবং ঘানা ২০২৩ সালে একই পথে হাঁটছে। বিশ্বজুড়ে ১০০টির বেশি দেশ আইনি বা কার্যত মৃত্যুদণ্ড বাতিল করেছে।

বিশ্বে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি—ফাঁসি, প্রাণনাশী ইনজেকশন ও গুলি। সৌদি আরব এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে শিরশ্ছেদকে পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করে। যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য নাইট্রোজেন গ্যাস যুক্ত হওয়ায় তা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে; বিশেষজ্ঞরা একে নিষ্ঠুর ও ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন।

মৃত্যুদণ্ড নিয়ে বিশ্বজুড়ে মতভেদ বাড়ছে—কোথাও এটি মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে বাতিলের পথে এগোচ্ছে, আবার কোথাও কঠোর অপরাধ দমনের উপায় হিসেবে টিকে আছে।