ঢাকা অফিস • প্রকাশিত: ২৭ জানুয়ারী ২০২৬, ০৮:১৩ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

বিদেশি বিনিয়োগ টানতে প্রবাসীদের জন্য নগদ প্রণোদনার নতুন দিগন্ত

বিদেশি বিনিয়োগ টানতে প্রবাসীদের জন্য নগদ প্রণোদনার নতুন দিগন্ত

বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই প্রবাহ বাড়াতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এখন থেকে প্রবাসীরা যদি দেশে বিদেশি বিনিয়োগ আনতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেন, তবে সেই বিনিয়োগের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে তাদের নির্দিষ্ট হারে নগদ প্রণোদনা প্রদান করা হবে। সোমবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) গভর্নিং বোর্ডের সভায় এই নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।

বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন সভা শেষে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এই নতুন উদ্যোগের বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি জানান যে, প্রবাসী বাংলাদেশিরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অত্যন্ত শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন। তাদের এই সামাজিক ও ব্যবসায়িক সংযোগকে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজে লাগাতে চায় সরকার। অনুমোদিত প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনো প্রবাসী বাংলাদেশি যদি দেশে ইকুইটি বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে পারেন, তবে তিনি সেই বিনিয়োগকৃত অর্থের ওপর ১.২৫ শতাংশ হারে নগদ প্রণোদনা পাবেন। এটি অনেকটা রেমিট্যান্সের ওপর বর্তমানে প্রচলিত নগদ প্রণোদনার মতোই একটি প্রক্রিয়া হিসেবে কাজ করবে। উদাহরণস্বরূপ বলা হয়েছে, যদি কোনো প্রবাসী ১০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগ আনতে সক্ষম হন, তবে সরকার তাকে স্বীকৃতিস্বরূপ সাড়ে ১২ লাখ ডলার প্রণোদনা দেবে।

এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো প্রবাসীদের কেবল ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য অর্থ পাঠানোয় সীমাবদ্ধ না রেখে তাদের শিল্প ও ব্যবসার বৃহৎ বিনিয়োগের অংশীদার করা। এর ফলে একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হবে, অন্যদিকে দেশে নতুন কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নের পথ সুগম হবে। তবে এই প্রস্তাবটি নীতিগতভাবে অনুমোদিত হলেও এর চূড়ান্ত বাস্তবায়নের জন্য এখন অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। সেখান থেকে সবুজ সংকেত পাওয়ার পরেই এটি কার্যকর হবে।

বিনিয়োগ আকর্ষণের কৌশল হিসেবে সরকার বিডার কার্যক্রম দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও বিস্তৃত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে প্রথম পর্যায়ে চীনে বিডার একটি অফিস স্থাপন করা হবে। পরবর্তীতে দক্ষিণ কোরিয়া এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোতেও অনুরূপ অফিস খোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এই বিদেশি অফিসগুলোর বিশেষত্ব হবে তাদের নিয়োগ পদ্ধতি। এখানে স্থায়ী বেতনের পরিবর্তে জনবল নিয়োগ করা হবে কমিশন বা সাফল্যভিত্তিক পারিশ্রমিকের ভিত্তিতে। অর্থাৎ, যারা বিনিয়োগ আনতে সফল হবেন, তারাই কেবল পারিশ্রমিক পাবেন। চীনের ক্ষেত্রে স্থানীয় ভাষা ও বাজার সম্পর্কে দক্ষ চীনা নাগরিকদের নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি অগ্রাধিকার পাবে যাতে করে বিনিয়োগকারীদের সাথে যোগাযোগ সহজতর হয়।

একই সভায় বাংলাদেশের বিনিয়োগ খাতের প্রশাসনিক সংস্কারের জন্য একটি বড় ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে দেশে বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট ছয়টি পৃথক সংস্থা কাজ করছে, যা অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টি করে। এই সমস্যা সমাধানে বিডা, বেজা, বেপজা, হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ, পিপিপি কর্তৃপক্ষ এবং বিসিককে একীভূত করে একটি একক ছাতার নিচে বা ‘সিঙ্গেল আমব্রেলা’ কাঠামোতে আনার রোডম্যাপ অনুমোদন করা হয়েছে। বর্তমানে এই প্রতিটি সংস্থার প্রধান হিসেবে সরকার প্রধান দায়িত্ব পালন করায় তদারকিতে ঘাটতি থেকে যায়। পরিসংখ্যান বলছে, অতীতে এই বোর্ড সভাগুলো গড়ে পাঁচ বছরে মাত্র একবার অনুষ্ঠিত হয়েছে। নতুন কাঠামোর আওতায় প্রতি ছয় মাস অন্তর নিয়মিত বোর্ড সভা নিশ্চিত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এই একীভূতকরণ প্রক্রিয়াটি যেন স্বচ্ছ হয় এবং কোনো সংস্থা যেন বাড়তি সুবিধা না পায়, সেজন্য একজন স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হবে। যদিও আইনগত ও কাঠামোগত এই বিশাল পরিবর্তনের কাজ পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের সময়ে পূর্ণতা পাবে, তবে বর্তমান সরকার এর নকশা ও রূপরেখা তৈরির কাজ সম্পন্ন করবে। এ ছাড়াও সরকারি সম্পদ বেসরকারিকরণ প্রক্রিয়ার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনাও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর ফলে এখন থেকে পেশাদার বিনিয়োগ ব্যাংকের মাধ্যমে কমিশন ভিত্তিতে সরকারি সম্পদ বেসরকারিকরণের পথ প্রশস্ত হবে। সংবাদ ব্রিফিংকালে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম উপস্থিত ছিলেন। সরকারের এই বহুমুখী উদ্যোগ দেশের ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতিতে নতুন গতির সঞ্চার করবে বলে আশা করা হচ্ছে।