দায়িত্ব ছাড়তে আর দুই মাসেরও কম বাকি। এরই মধ্যে ইসরায়েলে গিয়ে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করলেন নিউইয়র্ক সিটির বিদায়ী মেয়র এরিক অ্যাডামস। উদ্দেশ্য হিসেবে তিনি দেখিয়েছেন বৈশ্বিক ইহুদি–বিদ্বেষ বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা; তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই সফরের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য ছিল আসন্ন মেয়র জোহরান মামদানীকে ঘিরে ইহুদি সম্প্রদায়ের মধ্যে নিজের অবস্থানকে আরও স্পষ্ট করা।
তেল আবিবে কমব্যাট অ্যান্টিসেমিটিজম মুভমেন্ট আয়োজিত এক সংবর্ধনায় অ্যাডামসকে ইহুদিদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি আশ্বাস দেওয়ার বদলে উদ্বেগ বাড়ান। তিনি বলেন, “আমি যদি নিউইয়র্কের একজন ইহুদি হতাম, আমার সন্তানদের জন্য চিন্তিত থাকতাম। উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো কারণ আছে।” তিনি আরও বলেন, সম্প্রদায়কে “প্রস্তুত থাকতে হবে” কারণ “সবকিছু ঠিক নেই।”
মেয়র নির্বাচনী প্রচারণার সময়ও তিনি সতর্ক করেছিলেন যে মামদানী নির্বাচিত হলে নিউইয়র্ক “ইসলামি চরমপন্থার” ঝুঁকিতে পড়তে পারে। আগামী ১ জানুয়ারি নিউইয়র্কের প্রথম মুসলিম মেয়র হিসেবে শপথ নেবেন মামদানী, যিনি ইসরায়েল নীতির কঠোর সমালোচক।
অ্যাডামসের মন্তব্যে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে মামদানীর মুখপাত্র ডোরা পেকেচ বলেন, “নিউইয়র্কের লাখো ইহুদির সমর্থন পেয়ে মামদানী গর্বিত। তিনি আগামী মেয়াদে ইহুদি নিউইয়র্কারদের নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
নিউইয়র্ক জিউইশ অ্যাজেন্ডার নির্বাহী পরিচালক ফিলিসা উইজডম বলেন, “বিদায়ী মেয়রের এই ভয়–সৃষ্টিকারী মন্তব্যে নিউইয়র্কবাসীর নিরাপত্তা বাড়ে বলে মনে হয় না।”
ইসরায়েল সফরে অ্যাডামস গাজা থেকে মুক্ত তিন সাবেক জিম্মির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, কাউন্টার টেরোরিজম প্রশিক্ষণ সুবিধা পরিদর্শন করেন এবং জেরুজালেমের ওয়েস্টার্ন ওয়ালে প্রার্থনা করেন। তিনি বলেন, এটি ছিল ইসরায়েলের সঙ্গে নতুন সহযোগিতার পথ খোঁজার সুযোগ—যেখানে ইসরায়েলি কোম্পানিগুলো গত বছর নিউইয়র্কের অর্থনীতিতে ১৩ বিলিয়ন ডলার যুক্ত করেছে।
অ্যাডামসের জন্য সফরটি ছিল ব্যক্তিগতও। নিউইয়র্কের ইহুদি সম্প্রদায়ের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। তেল আবিবে পৌঁছে তিনি নাখালাত বিনইনাম সড়কে হাঁটেন এবং ইসরায়েলের সাবেক কনসাল আসাফ জামিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
এক সংবর্ধনায় তিনি অতীতের দুর্নীতির অভিযোগ ঘিরে নিজের কঠিন সময়ের কথা স্মরণ করে আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন, “অনেক দিন ছিল যখন বিছানা থেকে উঠতেই ইচ্ছে হতো না।”
রাজনৈতিক সমর্থন কমে যাওয়ায় অ্যাডামস পুনর্নির্বাচনে দাঁড়াননি। এখন তিনি নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে দৃঢ় করতে চাইছেন বলে বিশ্লেষকদের মত।
মেট কাউন্সিলের প্রধান নির্বাহী ডেভিড গ্রিনফিল্ড বলেন, “তার হাতে ৪৫ দিন আছে, আর তিনি চান সন্ত্রাসবাদ দমন, প্রযুক্তি ব্যবহারের বিস্তার এবং ইসরায়েল–বন্ধুত্বপূর্ণ ভাবমূর্তি—এসব বিষয়ে নিজের অবস্থানকে ইতিহাসে স্থায়ী করতে।”
মামদানী ঘোষণা দিয়েছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ইস্যু করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা অনুযায়ী ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু নিউইয়র্কে পা রাখলে তাকে গ্রেপ্তার করার নির্দেশ দেবেন। আইন বিশেষজ্ঞরা বলেন, এটি বাস্তবায়ন কঠিন এবং ফেডারেল আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিকও হতে পারে।
অন্যদিকে অ্যাডামস বলেছেন, নেতানিয়াহুর উচিত নিউইয়র্কে এসে মামদানীর অভিষেক অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া এবং ইহুদি সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করা।
দায়িত্ব ছাড়ার প্রস্তুতির মাঝেও অ্যাডামস জানালেন, তিনি কিছুটা বিশ্রাম নিতে চান। নির্বাচনের পরদিন সাংবাদিকদের বলেন, “সবচেয়ে বড় পরিকল্পনা হলো—মজা করা।”
সংবর্ধনার এক পর্যায়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি রসিকতা করে বলেন, তিনি নাকি ইসরায়েলে থাকার মতো জায়গা খুঁজবেন—এতে উপস্থিতদের মধ্যে হাসির রোল পড়ে।