বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক ইতিহাস, ভূগোল ও জনসম্পৃক্ততার কারণে কেবল কূটনৈতিক সম্পর্ক নয় এটি একটি সংবেদনশীল রাজনৈতিক বাস্তবতা। এই সম্পর্কের ভিত গড়ে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং পারস্পরিক নির্ভরতার উপর। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই সম্পর্কে যে টানাপোড়েন দৃশ্যমান হচ্ছে, তা আর কেবল দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক মতবিরোধের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই। বরং তা জনমনে সন্দেহ, অবিশ্বাস ও ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে। প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সেই বাস্তবতার দিকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। যেখানে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষার দায়িত্ব বিশেষভাবে শক্তিশালী পক্ষের কাঁধেই বেশি থাকে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি বিষয় দেশপ্রেমিক নাগরিকদের গভীরভাবে নাড়া দিচ্ছে। তা হলো, দেশের সাবেক স্বৈরশাসক, তার দোসর, ক্ষমতার অপব্যবহারকারী রাজনৈতিক সহযোগী ও নানা সময়ে চিহ্নিত সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের একটি অংশ প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় পাচ্ছে, সেখানে থেকে তারা নির্বিঘ্নে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিচ্ছে, রাজনৈতিক উসকানি ছড়াচ্ছে এবং ভারতীয় কিছু গণমাধ্যমে আশ্রয় পেয়ে পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশবিরোধী অপপ্রচার চালাচ্ছে। এটি কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় নয়, এটি সরাসরি দুই দেশের পারস্পরিক আস্থার প্রশ্নে আঘাত হানে।
রাষ্ট্রের মধ্যে বন্ধুত্ব কাগজে-কলমে ঘোষণায় নয়, বাস্তব আচরণে প্রকাশ পায়। যখন একটি দেশ দেখে যে তার গণতান্ত্রিক উত্তরণ, বিচারপ্রক্রিয়া কিংবা রাজনৈতিক পুনর্গঠনের বিরোধিতাকারীরা নিরাপদ আশ্রয় পেয়ে অন্য দেশের ভূখণ্ড থেকে কথা বলছে, তখন সেই দেশের জনগণের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে। এই আশ্রয় কি নিছক মানবিক, নাকি এর মধ্যে নীরব রাজনৈতিক সম্মতির ছায়া রয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর যতই কূটনৈতিকভাবে অস্বীকার করা হোক না কেন, জনমনে তার অভিঘাত অস্বীকার করা যায় না।
আরও উদ্বেগজনক হলো, ভারতীয় কিছু প্রভাবশালী গণমাধ্যমে বাংলাদেশকে ঘিরে যে ভাষা ও বয়ান ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে। সেখানে বাংলাদেশের গণআন্দোলন, রাজনৈতিক পরিবর্তন কিংবা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তকে প্রায়ই অস্থিতিশীলতা, মৌলবাদ বা নিরাপত্তা ঝুঁকির ফ্রেমে উপস্থাপন করা হচ্ছে। বাস্তব তথ্যের বদলে অনুমান, যাচাইয়ের বদলে রাজনৈতিক পক্ষপাত, আর বিশ্লেষণের বদলে ভীতিপ্রচার, এসবই ধীরে ধীরে বাংলাদেশ সম্পর্কে একটি বিকৃত ধারণা তৈরি করছে। কূটনীতিতে গণমাধ্যম সরাসরি রাষ্ট্র নয়, কিন্তু বাস্তবে গণমাধ্যমই জনমত গঠনের প্রধান কারিগর। ফলে এই অপপ্রচার থামাতে রাষ্ট্রের নীরবতা অনেক সময় সম্মতির মতোই ব্যাখ্যা হয়।
প্রথম আলোর সম্পাদকীয়তে “দায়িত্বশীল আচরণ”-এর যে আহ্বান, তা মূলত এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ভারতের দায়িত্ব কেবল কৌশলগত স্বার্থ দেখা নয়, বরং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, রাজনৈতিক বাস্তবতা ও জনআকাঙ্ক্ষার প্রতি সম্মান দেখানো। বাংলাদেশ কোনো উপগ্রহ রাষ্ট্র নয়, এটি একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। যার জনগণ বহু রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে নিজেদের রাষ্ট্রিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার অর্জন করেছে। সেই অধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার যে কোনো প্রচেষ্টা, তা রাজনৈতিক আশ্রয়, মিডিয়া বয়ান বা নীরব সমর্থনের মাধ্যমেই হোক, দুই দেশের সম্পর্কের ভিত দুর্বল করে।
এখানে বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও আত্মসমালোচনার সুযোগ রয়েছে। আবেগতাড়িত প্রতিক্রিয়া, কূটনৈতিক ভাষার কঠোরতা বা অপ্রস্তুত বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে। কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতা স্বীকার করেও বলতে হয়, সম্পর্কে ভারসাম্য রক্ষার দায় সবসময় সমান হয় না। যে পক্ষ শক্তিশালী, তার দায়িত্বও তুলনামূলক বেশি। প্রতিবেশীর অভ্যন্তরীণ সংকটে সুবিধা খোঁজা স্বল্পমেয়াদে লাভজনক মনে হলেও দীর্ঘ মেয়াদে তা আস্থাহীনতা সৃষ্টি করে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই সূক্ষ্ম বাস্তবতাগুলো কতটা আন্তরিকভাবে অনুধাবন করা হচ্ছে তার ওপর। সীমান্ত বাণিজ্য, নিরাপত্তা সহযোগিতা কিংবা আঞ্চলিক সংযোগ, সবই তখনই টেকসই হয়, যখন জনগণের মনে বিশ্বাস থাকে যে সম্পর্কটি সম্মানের, সমতার এবং পারস্পরিক স্বার্থের। অন্যথায় কাগুজে চুক্তি থাকলেও হৃদয়ের দূরত্ব বাড়তে থাকে।
এই প্রেক্ষাপটে দেশপ্রেমিক বাংলাদেশিদের জন্য সচেতন থাকা জরুরি। সম্পর্কের নামে আত্মসম্মান বিসর্জন দেওয়া যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি অযৌক্তিক বিদ্বেষও কূটনীতির পথ নয়। প্রয়োজন এক ধরনের প্রজ্ঞাপূর্ণ দৃঢ়তা। যেখানে বাংলাদেশ তার ন্যায্য উদ্বেগ স্পষ্টভাবে জানাবে, অপপ্রচার ও আশ্রয় প্রশ্রয়ের প্রশ্নে কূটনৈতিকভাবে জবাব চাইবে, আবার একই সঙ্গে আঞ্চলিক শান্তি ও সহযোগিতার দরজাও খোলা রাখবে।
প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সেই সূক্ষ্ম বার্তাটিই মনে করিয়ে দেয়। দুই দেশের সম্পর্ক রক্ষায় সবচেয়ে বড় প্রয়োজন দায়িত্বশীলতা, আর সেই দায়িত্ব কেবল কথায় নয়, কাজে প্রমাণিত হতে হয়। ইতিহাস সাক্ষী, আস্থা ভাঙতে সময় লাগে না, কিন্তু গড়তে লাগে বহু বছর। বাংলাদেশ আজ সেই আস্থার প্রশ্নটিই সামনে রেখে প্রতিবেশীর আচরণ পর্যবেক্ষণ করছে।