ঢাকা অফিস • প্রকাশিত: ২৫ ডিসেম্বার ২০২৫, ০৭:৫৮ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কে নতুন অস্থিরতা

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কে নতুন অস্থিরতা

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক শীতলতা এখন চরম উত্তেজনায় রূপ নিয়েছে। আগরতলা ও শিলিগুড়িতে বাংলাদেশি মিশনগুলোর কার্যক্রম স্থগিত করার পর পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে বাংলাদেশও ভারতীয় নাগরিকদের ভিসা প্রদান বন্ধ করে দিয়েছে। এর পাশাপাশি ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমান্তে নতুন শক্তিশালী সেনাঘাঁটি তৈরির ঘোষণা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

পাল্টাপাল্টি ভিসা স্থগিত

ত্রিপুরার আগরতলায় বাংলাদেশের ভিসা ও কনস্যুলার বিভাগ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। একইভাবে পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়িতে একটি বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে পরিচালিত বাংলাদেশ ভিসা আবেদন কেন্দ্রের কার্যক্রমও সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা একে 'টিট ফর ট্যাট' বা পাল্টা জবাব হিসেবে দেখছেন। ঢাকার কর্মকর্তাদের মতে, সম্প্রতি ভারতের আগরতলা ও শিলিগুড়িতে বাংলাদেশি মিশনের সামনে বিক্ষোভ এবং হামলার ঘটনার পর নিরাপত্তা জনিত কারণেই এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে কলকাতায় বাংলাদেশের ভিসা অফিস এখনও চালু থাকলেও সেখানে যেকোনো সময় তালা ঝুলে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সীমান্তে ভারতের সামরিক প্রস্তুতি

কূটনৈতিক লড়াইয়ের পাশাপাশি রণক্ষেত্রের প্রস্তুতি এখন সীমান্তের ওপারেও স্পষ্ট। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে জানা গেছে, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে মিজোরাম সীমান্তে আরও একটি শক্তিশালী সামরিক ঘাঁটি তৈরি করছে দেশটির সেনাবাহিনী। ১৭ মাউন্টেন স্ট্রাইক কোর-এর অধীনে এই ঘাঁটি স্থাপনের পাশাপাশি শিলচর ও মিজোরাম ফ্রন্টিয়ারের তিনটি ব্যাটালিয়ন বাঙ্কার এবং ভূগর্ভস্থ অস্ত্রাগার তৈরির কাজ শুরু করেছে।

ভারতের আশঙ্কা, বাংলাদেশের বর্তমান অস্থিতিশীলতাকে পুঁজি করে কোনো তৃতীয় পক্ষ উত্তর-পূর্ব ভারতকে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করতে পারে। বিশেষ করে 'চিকেনস নেক' বা শিলিগুড়ি করিডোরকে ঘিরে ভারতের উদ্বেগ এখন তুঙ্গে। এ কারণেই বিএসএফ-এর পাশাপাশি সরাসরি সেনাবাহিনী মোতায়েন এবং সামরিক অবকাঠামো বৃদ্ধির তোড়জোড় চলছে। এছাড়াও উত্তর-পূর্ব সীমান্তের হাসিমারা বিমানঘাঁটিতে অত্যাধুনিক 'রাফাল' যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হয়েছে, যা কয়েক মিনিটের ব্যবধানে বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্তে আঘাত হানতে সক্ষম।

জনমনে ক্ষোভ ও অরাজক পরিস্থিতি

দুই দেশের এই বৈরিতার প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের মনেও। বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব এখন কেবল রাজপথের মিছিলে সীমাবদ্ধ নেই, তা সাধারণ মানুষের মনেও ছড়িয়ে পড়েছে। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদীর মৃত্যু এবং প্রথম আলো বা ডেইলি স্টারের মতো গণমাধ্যমের কার্যালয়ে হামলার ঘটনা দেশজুড়ে এক অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।

ছাত্রনেতা সারজিস আলম ঘোষণা দিয়েছেন, হাদীর খুনিদের বিচার না হওয়া পর্যন্ত ভারতীয় দূতাবাস স্বাভাবিকভাবে চলতে দেওয়া হবে না। অন্যদিকে হাসনাত আবদুল্লাহর হুঁশিয়ারি—প্রয়োজনে ভারতের ‘সেভেন সিস্টার্স’ রাজ্যগুলোকে আলাদা করে দেওয়া হবে।

অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

বর্তমান এই সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নিয়ে। অনেকে মনে করছেন, ভারত হয়তো শেষ পর্যন্ত কোনো 'সার্জিক্যাল স্ট্রাইক' বা সীমিত মাত্রার সামরিক অভিযানের কথা ভাবছে যাতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তাদের প্রভাব পুনরায় প্রতিষ্ঠা করা যায়। তবে আন্তর্জাতিক মহলের নজরদারির কারণে এমন পদক্ষেপ নেওয়া ভারতের জন্য কতটা সহজ হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

আপাতত দুই দেশের কূটনৈতিক শিষ্টাচার মৃতপ্রায়, যার জায়গা নিয়েছে জেদ এবং পাল্টা হুঁশিয়ারি। এই বৈরিতা দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিকে এক গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।