বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং জননিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগের কথা তুলে ধরেছে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)। সংস্থাটির সর্বশেষ মাসিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুনের তুলনায় জুলাই মাসে সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও নির্যাতনের ঘটনা দ্বিগুণ হয়েছে। একই সময়ে ধর্ষণ, আত্মহত্যা এবং বিশেষ অভিযানে গ্রেপ্তারের সংখ্যাও বেড়েছে। এসব প্রবণতা দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে বলে মন্তব্য করেছে সংস্থাটি।
শুক্রবার প্রকাশিত এমএসএফের প্রতিবেদনে জানানো হয়, জুন মাসে সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও নির্যাতনের ১৮টি ঘটনা নথিভুক্ত হলেও জুলাইয়ে তা বেড়ে ৩৬টিতে পৌঁছেছে। সংস্থাটির মতে, এ ধরনের বৃদ্ধি স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের পরিবেশের জন্য উদ্বেগজনক। একই সঙ্গে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় মামলা ও গ্রেপ্তার বৃদ্ধির ঘটনাও অনলাইন মতপ্রকাশের ওপর চাপ বাড়ার ইঙ্গিত দেয়।
এমএসএফের সভাপতি সুলতানা কামালের সই করা বিজ্ঞপ্তিতে প্রকাশিত এ প্রতিবেদন দেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক এবং স্থানীয় মানবাধিকারকর্মীদের সরবরাহ করা তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই মাসে মব সহিংসতায় ৩১ জন নিহত হয়েছেন, যা আগের মাসে ছিল ৩২ জন। রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৭ জন। আহতের সংখ্যা ৩০৩ থেকে কমে ৯৫-এ নেমে এলেও নিহতের সংখ্যা সামান্য বৃদ্ধিকে সংঘর্ষের তীব্রতা অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছে এমএসএফ। একই সময়ে সরকার পতন-পরবর্তী মামলাগুলোতে আরও ৬০০ জনকে আসামি করা হয়েছে, যদিও গ্রেপ্তারের সংখ্যা কমে ১২৬ জনে দাঁড়িয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্ষেত্রেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। জুলাই মাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে ২ জন এবং কারাগারে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া গোলাগুলিসংক্রান্ত ঘটনায় কোনো মৃত্যুর খবর না থাকলেও আহতের সংখ্যা ২ থেকে বেড়ে ২১ জনে পৌঁছেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, জুলাই মাসে মোট ৮৯টি লাশ উদ্ধার হয়েছে, যার মধ্যে ৫৬টির পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। এমএসএফের মতে, বিপুলসংখ্যক অজ্ঞাত লাশের ঘটনা বিচারপ্রক্রিয়া ও মানবাধিকার সুরক্ষার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে সীমান্তে পুশ-ইন, আটক এবং বিচ্ছিন্ন হত্যাকাণ্ড, পাশাপাশি সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনাও উদ্বেগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষ অভিযানে গ্রেপ্তারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জুনে যেখানে ২ হাজার ৮৯৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, জুলাইয়ে সেই সংখ্যা বেড়ে ৫ হাজার ১৯৬ জনে পৌঁছেছে। এমএসএফ বলছে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তৎপরতা বাড়লেও এসব অভিযানের স্বচ্ছতা ও মানবাধিকার মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
নারী ও শিশু নির্যাতনের ক্ষেত্রেও মিশ্র চিত্র উঠে এসেছে। মোট ঘটনা ৩২০ থেকে কমে ৩০৬-এ নামলেও ধর্ষণের ঘটনা ৬৮ থেকে বেড়ে ৯০-এ পৌঁছেছে, যা প্রায় ৩৩ শতাংশ বৃদ্ধি। আত্মহত্যার ঘটনাও ১৭ থেকে বেড়ে ২৮ হয়েছে, অর্থাৎ প্রায় ৬৫ শতাংশ বৃদ্ধি। এমএসএফের মতে, এই পরিসংখ্যান নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা এবং সামাজিক মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে গভীর উদ্বেগের ইঙ্গিত বহন করে।
এছাড়া জুলাই মাসে পরিত্যক্ত অবস্থায় ১১টি নবজাতক উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮টি মৃত এবং ৩টি জীবিত ছিল। এমএসএফের অভিযোগ, এ ধরনের ঘটনায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কার্যকর তদন্তের অভাবে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা সম্ভব হয় না। সংস্থাটির মতে, বেআইনি সালিস, নবজাতক পরিত্যাগ এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি সামাজিক দায়মুক্তিকে আরও শক্তিশালী করছে।