বাংলাদেশে নতুন সরকারের যাত্রা একদিকে উচ্ছ্বাসের, অন্যদিকে অস্বস্তির। দীর্ঘদিনের দমন, নিপীড়ন, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনের বিরুদ্ধে যে তরুণ-ছাত্র জনতার ঢেউ দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল, তার ভিতরে ছিল একটি নৈতিক দাবি: কেবল সরকার পরিবর্তন নয়, শাসনপদ্ধতির পরিবর্তন। মানুষের প্রত্যাশা ছিল রাষ্ট্রের চরিত্র বদলাবে, ক্ষমতার আচরণ বদলাবে, রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলাবে। কিন্তু নতুন সরকারের সূচনালগ্নের কিছু লক্ষণ ইঙ্গিত দিচ্ছে। ব্যবস্থার কাঠামো অপরিবর্তিত থাকলে শুধু নেতৃত্ব পরিবর্তন গণতন্ত্রের নিশ্চয়তা দেয় না।
অভ্যুত্থানের ভাষা ছিল “সংস্কার”, কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের ভাষা এখনো “নিয়ন্ত্রণ”। আন্দোলনের সময়ে যে স্লোগানগুলো শোনা গিয়েছিল: প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অবসান, অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা, সেগুলো ছিল মূলত রাষ্ট্র পুনর্গঠনের নীতিমালা। অথচ সরকার গঠনের পরপরই সংস্কার প্রস্তাবগুলোকে অগ্রাধিকার না দিয়ে প্রশাসনিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ইতিহাস বলছে, অনেক বিপ্লবই ব্যর্থ হয় শাসক পরিবর্তনের পর রাষ্ট্রযন্ত্র অপরিবর্তিত রেখে দেওয়ার কারণে। পুরনো কাঠামোর ভেতরে নতুন সরকার ঢুকলে সে কাঠামোই তাকে ধীরে ধীরে নিজের মতো করে নেয়।
প্রথম দিকের কিছু সিদ্ধান্তে দলীয়করণের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নিয়োগ, প্রশাসনিক পদায়ন, বিশ্ববিদ্যালয় ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠছে। যদিও সরকার তা অস্বীকার করছে। কিন্তু গণতন্ত্রে অভিযোগের সত্যতা শুধু আইনি নয়, রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নও। জনতার আন্দোলন যে রাষ্ট্র নিরপেক্ষতার দাবি তুলেছিল, তা যদি দলীয় আনুগত্যের পরীক্ষায় পরিণত হয়, তাহলে পরিবর্তনের নৈতিক শক্তি ক্ষয়ে যায়। ক্ষমতার কাঠামো যত দ্রুত নিরপেক্ষ হবে, গণতন্ত্র তত দ্রুত বিশ্বাসযোগ্য হবে।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান কেবল রাজনৈতিক ছিল না, এটি ছিল সামাজিক আস্থা পুনর্গঠনের আন্দোলন। মানুষ মনে করেছিল রাষ্ট্র তাদের বিরুদ্ধে নয়, তাদের পক্ষেই থাকবে। কিন্তু শুরুতেই যখন সংস্কার এজেন্ডা পিছিয়ে পড়ে এবং ক্ষমতা পরিচালনার প্রথাগত পদ্ধতি ফিরে আসে, তখন জনগণের মধ্যে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক সংশয় জন্মায়: আন্দোলনে কি কেবল শাসক বদলেছে, না কি রাষ্ট্র বদলেছে?
এখানেই নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। নির্বাচন জেতা রাজনৈতিক সাফল্য, কিন্তু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা একটি নৈতিক সাফল্য। গণতন্ত্র কেবল ভোট নয়, এটি ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা স্বীকারের সংস্কৃতি। বিরোধী মতের নিরাপত্তা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, প্রশাসনের অরাজনৈতিক আচরণ, বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা এসব প্রতিষ্ঠিত না হলে গণতন্ত্র কাগজে থাকে, জীবনে নয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের সামনে তিনটি স্পষ্ট পথ খোলা আছে। প্রথম পথ: প্রথাগত ক্ষমতার রাজনীতি, এতে স্থিতিশীলতা থাকবে, কিন্তু আস্থা থাকবে না। দ্বিতীয় পথ: আংশিক সংস্কার, এতে স্বল্পমেয়াদে জনপ্রিয়তা মিলতে পারে, কিন্তু কাঠামোগত সংকট থেকে যাবে। তৃতীয় পথ: গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, এটি কঠিন কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল ও বৈধতা সম্পন্ন করবে।
সমস্যা হলো, বিপ্লবের শক্তি দ্রুত ক্ষয় হয়। আন্দোলনের সময় জনতার শক্তি রাজনীতিকে চালিত করে, কিন্তু সরকার গঠনের পর রাজনীতি জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। নতুন সরকার যদি মনে করে আন্দোলনের শক্তি আর প্রয়োজন নেই, তাহলে সেটিই হবে সবচেয়ে বড় কৌশলগত ভুল। কারণ আন্দোলনের নৈতিক শক্তিই সরকারের বৈধতার ভিত্তি।
বাংলাদেশের ইতিহাসে বহুবার ক্ষমতা পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতি অপরিবর্তিত থেকেছে। ফলে জনগণের প্রত্যাশা ও রাষ্ট্রের আচরণের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। এই দূরত্বই অবিশ্বাস, হতাশা এবং শেষ পর্যন্ত নতুন অস্থিরতার জন্ম দেয়। নতুন সরকারের সামনে সুযোগ আছে সেই চক্র ভাঙার। তবে শর্ত একটাই, রাষ্ট্রকে দল থেকে বড় ভাবতে হবে।
অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, প্রশাসন, এসবের তাৎক্ষণিক চাপের কারণে সরকার যদি সংস্কারকে বিলাসিতা মনে করে, তবে তা হবে স্বল্পদৃষ্টির সিদ্ধান্ত। কারণ সংস্কার না করলে অস্থিরতা ফিরে আসে, আর অস্থিরতা ফিরে আসলে উন্নয়ন টেকে না। উন্নয়ন ও গণতন্ত্র একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয় বরং দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়নের ভিত্তি হলো বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক ব্যবস্থা।
নতুন সরকারের প্রথম কয়েক মাসই নির্ধারণ করবে তারা ইতিহাসে কিভাবে স্মরণীয় হবে, ক্ষমতার ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে না কি রাষ্ট্র পুনর্গঠনের সূচনা হিসেবে। ছাত্র-তরুণদের অভ্যুত্থান ছিল ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের একটি নৈতিক চুক্তি। সেই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে। আর উপেক্ষিত হলে এটি আরেকটি অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির গল্প হয়ে থাকবে।
বাংলাদেশ এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। পরিবর্তনের সম্ভাবনা যেমন বাস্তব, তেমনি পুনরাবৃত্তির আশঙ্কাও বাস্তব। নতুন সরকারের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা শুধু ভালো শাসন নয়। ন্যায়সঙ্গত শাসন। যদি তারা ক্ষমতার পুরনো পদ্ধতিকে পুনরুজ্জীবিত করে, তবে এটি হবে পুরনো বন্দোবস্তের নতুন যাত্রা। আর যদি তারা কাঠামোগত সংস্কারের সাহস দেখায়, তবে এটিই হতে পারে গণতন্ত্রের সত্যিকারের শুরু।