বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রতিবেশী দেশ ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায় সূচিত হতে যাচ্ছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে বিএনপির নিরঙ্কুশ জয়ের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উষ্ণ অভিনন্দন জানিয়েছেন। একইসঙ্গে দুই দেশের ঐতিহাসিক ও বহুমাত্রিক সম্পর্ককে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে নয়াদিল্লি।
শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, “বাংলাদেশের সঙ্গে বহুমাত্রিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদার করতে ভারত অত্যন্ত আগ্রহী। আমরা নতুন সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে উন্মুখ।”
শপথ অনুষ্ঠানে ওম বিড়লা ও মোদির ব্যক্তিগত চিঠি
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় বাংলাদেশের নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারত সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেন লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা। অনুষ্ঠান চলাকালে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতে নরেন্দ্র মোদির একটি বিশেষ ব্যক্তিগত চিঠি হস্তান্তর করেন।
চিঠিতে মোদি একটি "গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক" বাংলাদেশ গড়ে তুলতে ভারতের পূর্ণ সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। এছাড়া তিনি তারেক রহমানকে সুবিধাজনক সময়ে ভারত সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানান। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, মোদি তার চিঠিতে তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জোবায়দা রহমান এবং কন্যা জাইমা রহমানকেও ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
সহযোগিতার ক্ষেত্র ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কানেক্টিভিটি, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, জ্বালানি ও স্বাস্থ্যসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে দুই দেশ একে অপরের টেকসই উন্নয়নের অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে। জয়সওয়াল বলেন, “দুটি দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি হিসেবে ভারত ও বাংলাদেশ একে অপরের সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিবিড়ভাবে কাজ করবে।”
ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, নতুন সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে এসব সমস্যার সমাধান করা হবে। এছাড়া শপথ অনুষ্ঠানের ফাঁকে ওম বিড়লা মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জু এবং ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগের সঙ্গেও দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন, যা আঞ্চলিক কূটনীতিতে ভারতের সক্রিয়তারই ইঙ্গিত দেয়।
সম্পর্কের নতুন সমীকরণ: ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের গত নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট ৩০০ আসনের মধ্যে ২১২টি আসনে জয়লাভ করার পর ভারতের এই দ্রুত ও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, মোদি সরকারের এই উদ্যোগ তা কাটিয়ে ওঠার একটি বলিষ্ঠ পদক্ষেপ।
কেন এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ?
১. গণতান্ত্রিক বৈধতা: মোদির চিঠিতে ‘গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক’ বাংলাদেশের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, ভারত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের বাস্তবতা গ্রহণ করে নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী অংশীদারিত্ব গড়তে চায়।
২. অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা: বাংলাদেশ ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। বিশেষ করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও ট্রান্সশিপমেন্টের মতো বিষয়গুলোতে দুই দেশের স্বার্থ ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
৩. নিরাপত্তা উদ্বেগ: উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদ দমন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বাংলাদেশের সহযোগিতা ভারতের কাছে অপরিহার্য। তারেক রহমানের সঙ্গে মোদির ‘নিবিড়ভাবে কাজ করার’ প্রত্যয় সেই নিরাপত্তার নিশ্চয়তাকেই খুঁজছে।
চ্যালেঞ্জ যেখানে:
তারেক রহমান সরকার সম্ভবত ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘পারস্পরিক মর্যাদা ও সমতা’র ওপর জোর দেবে। বিশেষ করে সীমান্ত হত্যা বন্ধ এবং তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তির মতো অমীমাংসিত ইস্যুগুলো নতুন সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা হবে। অন্যদিকে, শেখ হাসিনাকে হস্তান্তরের যে আইনি প্রক্রিয়া বাংলাদেশে শুরু হয়েছে, তা দিল্লির জন্য একটি কূটনৈতিক অস্বস্তির কারণ হতে পারে।
নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণ গ্রহণ করে তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরটি হবে দুই দেশের আগামীর সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণকারী মূল চাবিকাঠি। দক্ষিণ এশিয়ায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ঢাকা ও দিল্লির এই ‘পাওয়ার রিকনসিলিয়েশন’ বা ক্ষমতার পুনর্মিলন অত্যন্ত জরুরি।