এখন সময় ডেস্ক • প্রকাশিত: ২৮ অক্টোবার ২০২৫, ১২:৪২ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে প্রতিদিন চারশ’র বেশি সাইবার হামলা

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে প্রতিদিন চারশ’র বেশি সাইবার হামলা

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে প্রতিদিন গড়ে ৪০০–এর বেশি সাইবার হামলার ঘটনা ঘটছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে চালানো এসব আক্রমণের বড় অংশই আসছে চীন, উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়া থেকে। বাংলাদেশের ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)-এর গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশের ব্যাংক খাতে হওয়া মোট সাইবার হামলার অর্ধেকের উৎস এই তিন দেশ। এর মধ্যে এক-চতুর্থাংশ হামলাই হচ্ছে চীন থেকে।

বিআইবিএমের উপস্থাপিত ‘Cyber Security in Financial Sector of Bangladesh: Securing the Digital Future’ শীর্ষক গবেষণা অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ব্যাংকগুলো তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রায় ৫৩ হাজার ৪১৩ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। যদিও এ বিনিয়োগের ৯৫ শতাংশ ব্যয় হয়েছে হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার ও নেটওয়ার্কিং–সংক্রান্ত কাজে, সাইবার নিরাপত্তায় ব্যয় হয়েছে মাত্র ৫ শতাংশ। বর্তমানে ব্যাংকিং লেনদেনের ৯৫ শতাংশই ডিজিটাল মাধ্যমে সম্পন্ন হলেও, সাইবার নিরাপত্তায় অপ্রতুল বিনিয়োগের কারণে ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকগুলোর ডিজিটাল সুরক্ষা ব্যবস্থাও সমানতালে এগোয়নি। অনেক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও এমডিদের সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান নেই, যার ফলে আইটি বিভাগের কর্মকর্তারা প্রয়োজনীয় প্রস্তাব উপস্থাপন করতেও দ্বিধাগ্রস্ত হন। নিরাপত্তা জোরদারে ভয় ও উদাসীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে প্রয়োজনীয় অর্থ বিনিয়োগের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৩–২৪ অর্থবছরে প্রতিদিন ব্যাংক খাতে ১৪৫ থেকে ৬৩০টি সাইবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২৪ শতাংশ এসেছে চীন থেকে, ১৩ শতাংশ উত্তর কোরিয়া থেকে এবং ১২ শতাংশ রাশিয়া থেকে। যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তান থেকে ৭ শতাংশ করে, রোমানিয়া ও তুরস্ক থেকে ৫ শতাংশ, বুলগেরিয়া থেকে ৪ শতাংশ এবং ভারত, তাইওয়ান ও হাঙ্গেরি থেকে ৩ শতাংশ করে হামলা হয়েছে। দেশের ভেতর থেকেও ২ শতাংশ হামলার উৎস শনাক্ত হয়েছে।

হামলার ধরনে দেখা গেছে, ব্যাংকগুলো সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে অ্যাডভান্সড পারসিসট্যান্ট থ্রেট (এপিটি) বা গুপ্ত হামলায়। এরপর রয়েছে ম্যালওয়্যার, র‍্যানসমওয়্যার, ক্রস-সাইট স্ক্রিপ্টিং (এক্সএসএস), এসকিউএল ইনজেকশন, স্পিয়ার ফিশিং ও ব্যাকডোর ইনস্টলেশনসহ আরও নানা আক্রমণ। এসব হামলায় ৮৫ শতাংশ ক্ষেত্রে কর্মীদের মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ৫৩ শতাংশ ক্ষেত্রে ব্যাংকের কার্যক্রম ব্যাহত হয়।

তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক খাতে সংঘটিত সাইবার অপরাধের ২৭ শতাংশের পেছনে রয়েছে আইটি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান (ভেন্ডর)। ২৪ শতাংশ ক্ষেত্রে হামলাকারীদের শনাক্ত করা যায়নি, ১৬ শতাংশ ক্ষেত্রে ব্যাংকের নিজস্ব কর্মী জড়িত। হ্যাক্টিভিস্টদের অংশগ্রহণও ১৬ শতাংশ। এছাড়া ১১ শতাংশ হামলা প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠান, ৭ শতাংশ বিদেশি রাষ্ট্র এবং ৬ শতাংশ গ্রাহক-সম্পর্কিত উৎস থেকে এসেছে।

সাইবার সচেতনতার ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি নাজুক। ব্যাংকের মাত্র ৪ শতাংশ কর্মী উৎকৃষ্ট পর্যায়ের সাইবার সচেতন। ২২ শতাংশের সচেতনতা দুর্বল এবং ২৮ শতাংশ কর্মীর অবস্থান অত্যন্ত নাজুক। গ্রাহকদের ক্ষেত্রেও একই চিত্র—মাত্র ৭ শতাংশ উৎকৃষ্ট পর্যায়ে সচেতন, বিপরীতে ৩১ শতাংশ খুবই অজ্ঞ বা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছেন।

বিআইবিএমের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ব্যাংক খাতে আইটি কর্মী ছিল ৫ হাজার ৮৭৫ জন, যা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ২৫০ জনে। তবে তাদের দক্ষতার মান মাত্র ৩.২ শতাংশ। অন্যদিকে, ব্যাংক খাতে ৭২ শতাংশ জালিয়াতি হয় সুইফট পদ্ধতির মাধ্যমে, ২০ শতাংশ সফটওয়্যার ব্যবহার করে, আর বাকি অংশ এটিএম, মোবাইল ব্যাংকিং ও ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ঘটে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত দেশে ব্যাংক আমানত হিসাব রয়েছে ১৬ কোটি ৫৭ লাখের বেশি, আর ঋণ হিসাব রয়েছে ১ কোটি ৩৪ লাখেরও বেশি। ব্যাংকগুলো এখন ১১ হাজারেরও বেশি শাখা, ১২ হাজার ৯০০-এর বেশি এটিএম ও ৭ হাজার ৩৪৫টি সিআরএমের মাধ্যমে সেবা দিচ্ছে। এছাড়া রয়েছে ১ লাখ ৩৩ হাজারেরও বেশি পিওএস মেশিন, ১৪ লাখ ৩০ হাজার এমএফএস এজেন্ট এবং ১৪ কোটি ৫০ লাখের বেশি এমএফএস হিসাবধারী।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় টেকসই অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হলে প্রযুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শক্তিশালী সাইবার প্রতিরক্ষা গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায়, ডিজিটাল অগ্রগতির এই পথেই লুকিয়ে রয়েছে বড় ধরনের বিপদের আশঙ্কা।