আকস্মিক বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ছয় জেলায়। তবে পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে সামনে আসছে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, বান্দরবান, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে অন্তত ৪০ হাজার হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি হাজার হাজার পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়েছে, মাছের ঘের ও পুকুর ভেসে গেছে এবং গ্রামীণ অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন প্রান্তিক কৃষকেরা। আউশ ধান, আমনের বীজতলা, গ্রীষ্মকালীন সবজি, আদা, হলুদ, পান ও ফলের বাগান বন্যার পানিতে নষ্ট হয়েছে। অনেক কৃষক নতুন করে চারা সংগ্রহ করে জমিতে রোপণের চেষ্টা করছেন।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম জেলা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ১ লাখ ২২ হাজার ৬৮৫টি কৃষিনির্ভর পরিবার ক্ষতির মুখে পড়েছে। প্রায় ১৬ হাজার ৯৪ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে আউশ ধান, আমনের বীজতলা, গ্রীষ্মকালীন সবজি, আদা, হলুদ ও পানের বরজ। ক্ষতির বড় অংশই দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাঁশখালী, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও সীতাকুণ্ড উপজেলায় হয়েছে।
বন্যার কারণে বাঁশখালী উপজেলায় প্রায় ৩০ হাজার মাটির ঘর ধসে পড়েছে। সাতকানিয়ায় প্রাথমিক হিসাবে ২ হাজার ৪৮০টি বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানি পুরোপুরি না নামায় ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি।
পাহাড়ি ঢল ও ভারী বর্ষণে বান্দরবানের সাতটি উপজেলায় কৃষি খাতে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। জেলা প্রশাসনের হিসাবে, ২ হাজার ১০৪ হেক্টর কৃষিজমি ও বাগান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এর মধ্যে ৩৬৮ হেক্টরের ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। প্রায় ৫ হাজার ৩২৩ জন কৃষক সরাসরি ক্ষতির শিকার হয়েছেন। আমনের বীজতলা, আউশ ধান, গ্রীষ্মকালীন সবজি, আদা, হলুদ ও ফলের বাগান সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রাঙামাটিতে বন্যার পাশাপাশি পাহাড়ধস পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সরকারি হিসাবে, জেলায় প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। জীবন বাঁচাতে ৬ হাজার ১৫৫ জনকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে হয়েছে। প্রায় ৩ হাজার ৬৭৫ হেক্টর ফসলি জমি প্লাবিত হয়েছে। মাছের ঘের অক্ষত থাকলেও মাছ ও খামারের অবকাঠামোগত ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪ কোটি টাকা। এছাড়া জেলার ৫৪৫ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কক্সবাজারের ১০ উপজেলায় প্রায় ৪ হাজার হেক্টর জমির ফসল বন্যার পানিতে ডুবে গেছে। এতে অন্তত ৪৩ হাজার ২১০ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আউশ ধানের খেত, বীজতলা, শাকসবজি ও পানের বরজ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য বীজ, সার ও অন্যান্য প্রণোদনা সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
মৌলভীবাজারে প্রায় ১৪ হাজার ৫৫১ হেক্টর জমির আমন ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। পাকা আউশ ধান ও বিভিন্ন ধরনের সবজিও নষ্ট হয়েছে। অনেক কৃষক নতুন করে আমনের চারা রোপণ শুরু করেছেন। কৃষি বিভাগের পাশাপাশি মৎস্য খাতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জেলার প্রায় ৫০০ মাছের ঘের ভেসে গেছে এবং প্রায় ১৭ কোটি ৮১ লাখ টাকার মাছ বন্যার পানিতে হারিয়ে গেছে বলে জানিয়েছে জেলা মৎস্য বিভাগ।
অন্যদিকে, ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিতে হবিগঞ্জের খোয়াই নদের প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে অন্তত ৩৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। প্রায় ৬৯৭ হেক্টর আউশ ধানের জমি, ১৩১ হেক্টর শাকসবজির খেত এবং ২০ হেক্টর ফলের বাগান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া চারটি উপজেলায় ১ হাজার ৪৫৩টি মাছের পুকুর ও ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রায় ৬১৩ টন মাছ ভেসে গেছে।
বন্যার পানি সরে গেলেও ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে পুনর্বাসনের চ্যালেঞ্জ এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। কৃষকেরা নতুন করে চাষাবাদ শুরু করতে বীজ, সার ও আর্থিক সহায়তার অপেক্ষায় রয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত পুনর্বাসন কর্মসূচি গ্রহণ না করা হলে এবারের বন্যার প্রভাব আগামী মৌসুমের খাদ্য উৎপাদনেও পড়তে পারে।