বরিশাল জেলা সদর থেকে প্রায় ২৪ কিলোমিটার দূরে গৌরনদী উপজেলার কসবা গ্রাম。 ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের পাশেই লোকচক্ষুর অন্তরালে দাঁড়িয়ে আছে এক অনন্য স্থাপত্য বিস্ময়, যা স্থানীয়দের কাছে 'আল্লাহর মসজিদ' বা 'গায়েবি মসজিদ' নামে পরিচিত。 কয়েকশ বছর আগে গভীর জঙ্গল পরিষ্কার করার সময় হঠাৎ আবিষ্কৃত হওয়া এই মসজিদটি কেবল একটি উপাসনালয় নয়, বরং এটি বাংলার সুলতানি আমলের শৌর্য ও শৈল্পিক উৎকর্ষের এক জীবন্ত দলিল。
ইতিহাস ও লোককথা:
কসবা মসজিদের নির্মাণ নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট শিলালিপি পাওয়া যায়নি。 তবে এর গঠনশৈলী দেখে প্রত্নতাত্ত্বিকরা ধারণা করেন, এটি ১৫শ বা ১৬শ শতাব্দীতে নির্মিত হয়েছিল。 জনশ্রুতি আছে, সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে এই প্রাচীন কাঠামোটি পুনরায় লোকচক্ষুর সামনে আসে。 নির্মাতা কে ছিলেন তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, এর স্থাপত্যশৈলী বাগেরহাটের খান জাহান আলীর রীতির সাথে হুবহু মিলে যায়。
স্থাপত্যের বিস্ময়:
এই মসজিদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর ৮ ফুট (২.১৮ মিটার) পুরু দেয়াল。 গবেষকদের মতে, এটি কেবল নান্দনিকতার জন্য নয়, বরং তৎকালীন জলদস্যু বা বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য একটি 'নিরাপত্তা দুর্গ' হিসেবেও ব্যবহৃত হতো。 বর্গাকার এই মসজিদের ছাদে রয়েছে ৯টি সুদৃশ্য গম্বুজ。 অবাক করার মতো বিষয় হলো, মসজিদের ভেতরে থাকা চারটি বিশাল কালো ব্যাসাল্ট পাথরের স্তম্ভ এই গম্বুজগুলোর ভার যুগ যুগ ধরে বহন করে আসছে。 পাথরশূন্য এই পলিমাটির দেশে এত ভারী পাথর শত শত মাইল দূর থেকে নদীপথে আনা সেকালের এক প্রকৌশল বিস্ময়。
পোড়ামাটির শিল্প বা ট্যারাকোটা:
মসজিদটির মেহরাব ও দেয়ালে বাংলার চিরচেনা পোড়ামাটির অলঙ্করণ বা 'ট্যারাকোটা' শিল্প দেখা যায়。 এখানে লতাপাতা, শিকল, পদ্মফুল এবং গোলাপের জ্যামিতিক নকশা খোদাই করা হয়েছে。 এই নকশাগুলো মধ্যযুগীয় বাংলার লোকজ শিল্প এবং ইসলামিক ঐতিহ্যের এক সার্থক মেলবন্ধন。
উপসংহার ও বর্তমান প্রেক্ষাপট:
বর্তমানে এটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে সংরক্ষিত হলেও এর দেয়ালে নোনা ধরা এবং সংস্কারের অভাব লক্ষ্য করা যায়。 নূর জাহানের রাজকীয় সিলমোহর এবং প্রাচীন দিঘির স্মৃতি নিয়ে টিকে থাকা এই মসজিদটি আমাদের ইতিহাসের এক অমূল্য অংশ。 যথাযথ প্রচার ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে কসবা মসজিদ হয়ে উঠতে পারে আন্তর্জাতিক মানের এক পর্যটন কেন্দ্র。
লেখক পরিচিতি: মাহফুজা আক্তার
গবেষক, ইসলামিক ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ
সরকারি বিএম কলেজ, বরিশাল (জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়)।