এখন সময় ডেস্ক • প্রকাশিত: ২৭ জানুয়ারী ২০২৬, ০৮:৪৩ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

ফ্লোরিডার দুর্গে ফাটল এবং ট্রাম্পের রাজনৈতিক বিপর্যয়

ফ্লোরিডার দুর্গে ফাটল এবং ট্রাম্পের রাজনৈতিক বিপর্যয়

আমেরিকার রাজনৈতিক মানচিত্রে রিপাবলিকানদের সবচেয়ে শক্তিশালী দুর্গ হিসেবে পরিচিত ফ্লোরিডায় এক অভাবনীয় ধস নেমেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিজের স্টেট, যেখানে তিনি গত নির্বাচনে বিশাল ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন, সেখানেই এখন তিনি জনসমর্থনের তলানিতে এসে ঠেকেছেন। শুক্রবার সকালে প্রকাশিত মারিস্ট পোলের (Marist Poll) এক চাঞ্চল্যকর জনমত জরিপে দেখা গেছে, ট্রাম্প এখন ফ্লোরিডায় সংখ্যালঘু অবস্থানে চলে গেছেন। এই জরিপটি কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং এটি ট্রাম্পের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের জন্য এক অশনি সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ভোটারদের পরিসংখ্যান: জনসমর্থনের নাটকীয় পরিবর্তন

২০২৪ সালের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প ফ্লোরিডায় ৫৬ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছিলেন, যা তাকে একচ্ছত্র আধিপত্য এনে দিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান জরিপের পরিসংখ্যান বলছে:

বর্তমান সমর্থন: ট্রাম্পের সমর্থন ১২ শতাংশ কমে এখন মাত্র ৪৪ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে।

প্রতিপক্ষের অবস্থান: ডেমোক্র্যাট প্রার্থীর প্রতি সমর্থন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৮ শতাংশে।

প্রবীণ ভোটারদের বিচ্যুতি: ফ্লোরিডার রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো প্রবীণ ভোটাররা (৬৫+ বয়স)। এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে ট্রাম্পের সমর্থন প্রায় ২০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

গোষ্ঠীভিত্তিক পরিবর্তন: ভেনিজুয়েলা এবং কিউবান আমেরিকানদের মধ্যে গত নির্বাচনে ট্রাম্প যেখানে বিপুল জনপ্রিয় ছিলেন, সেখানে এবার বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ল্যাটিনো ভোটারদের একটি বড় অংশ এখন ট্রাম্পের ঘোষিত ‘ট্যারিফ’ বা বাণিজ্যিক শুল্ক নীতির কারণে সরাসরি তার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

শহরতলির নারী ভোটার: ফ্লোরিডার শহরতলি বা সাব-আরবান অঞ্চলের নারীদের মধ্যে ট্রাম্পের গ্রহণযোগ্যতা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে, যারা এখন অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে উগ্র রাজনীতির চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

বীমা খাতের ধস: একটি অর্থনৈতিক সুনামি

ফ্লোরিডার এই রাজনৈতিক ধসের পেছনে সবচেয়ে বড় বাস্তব কারণ হলো বীমা খাতের নজিরবিহীন বিপর্যয়। জাপানের বন্ড মার্কেটে অস্থিরতার কারণে ফ্লোরিডার সম্পত্তি বীমা বাজার বা প্রপার্টি ইন্স্যুরেন্স মার্কেট পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে।

দেউলিয়া বীমা কোম্পানি: জাপানি বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় ইতোমধ্যে ৩টি বড় বীমা কোম্পানি নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করেছে।

বীমাহীন নাগরিক: এই দেউলিয়া হওয়ার সরাসরি প্রভাবে প্রায় ৪ লাখ ফ্লোরিডাবাসী বর্তমানে তাদের ঘরবাড়ির কোনো বীমা সুবিধা পাচ্ছেন না। তারা এখন এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

কিস্তির অসহনীয় বৃদ্ধি: যারা এখনও বীমার আওতায় আছেন, তাদের অবস্থা আরও শোচনীয়। আগে যেখানে একজন প্রবীণ নাগরিকের মাসিক বীমা কিস্তি ছিল ৫০০ ডলার, তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ডলারে। পেনশনের টাকায় যারা চলেন, তাদের জন্য এই ৪ গুণ বর্ধিত খরচ মেটানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

সম্পত্তি বিক্রি ও মূল্যহ্রাস: বীমার খরচ মেটাতে না পেরে অনেক মালিক তাদের সম্পত্তি বিক্রি করতে চাইলেও বাজারে কোনো ক্রেতা নেই। কারণ বীমা ছাড়া ব্যাংকগুলো নতুন ক্রেতাদের ঋণ দিচ্ছে না। ফলে মানুষের সারাজীবনের সঞ্চয় বা বাড়ির বাজারমূল্য রাতারাতি কমে গেছে।

কন্ডোমিনিয়াম সংকট ও নিঃস্ব মালিকরা

ফ্লোরিডার আবাসন খাতের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো 'কন্ডোমিনিয়াম' বা ফ্ল্যাট মালিকানা। নতুন সরকারি আইনের কারণে এই ফ্ল্যাট মালিকদের ওপর বিশাল অংকের সংস্কার ফি (Special Assessment) চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এই ফি-এর পরিমাণ ২০ থেকে ৩০ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যাচ্ছে। প্রবীণ এবং মধ্যবিত্ত মালিকদের এই অর্থ পরিশোধ করার সামর্থ্য নেই। তারা তাদের শখের ফ্ল্যাট বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন, কিন্তু বাজারে ক্রেতা না থাকায় তাদের জীবন এখন অনিশ্চয়তার মুখে। এই 'অকাল আবাসন সংকট' ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছে।

পর্যটন শিল্পে মন্দা ও মিত্রদের নীরবতা

ফ্লোরিডার অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হলো পর্যটন। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক অস্থিরতার কারণে পর্যটকের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। ডিজনি ওয়ার্ল্ডসহ বিভিন্ন থিম পার্ক তাদের কর্মঘণ্টা কমিয়ে দিয়েছে এবং কর্মী ছাঁটাই শুরু করেছে। পর্যটন খাতের কর্মীরা এখন ট্রাম্পের "মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন" স্লোগানের বিপরীতে "মেক আমেরিকা গো অ্যাওয়ে" (Make America Go Away) স্লোগানকে সমর্থন দিচ্ছে। রাজনৈতিকভাবেও ট্রাম্প এখন কোণঠাসা। ফ্লোরিডার প্রভাবশালী গভর্নর রন ডিস্যান্টিসকে এই সংকটের সময় ট্রাম্পের পাশে দেখা যাচ্ছে না।

বিশ্ব ব্যবস্থার নতুন মেরুকরণ

এই সামগ্রিক পরিস্থিতির গভীর বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, ট্রাম্পের 'কালচারাল ওয়ার' বা উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতি এখন আর সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যার সমাধান দিতে পারছে না। ফ্লোরিডার ভোটাররা এখন উগ্রবাদের চেয়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ট্রাম্পের ঘোষিত ট্যারিফ যুদ্ধ কেবল বিদেশের শত্রু নয়, বরং তার নিজের স্টেটের সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ফ্লোরিডার এই পরিবর্তন কেবল একটি স্টেটের বিষয় নয়; এটি ২০২৬ সালের আসন্ন কংগ্রেস নির্বাচনের জন্য একটি বিশাল সংকেত। যদি ট্রাম্প তার নিজের সুরক্ষিত দুর্গে সংখ্যালঘু হয়ে পড়েন, তবে পেনসিলভানিয়া, মিশিগান বা উইসকনসিনের মতো দোদুল্যমান স্টেটগুলোতে তার বিজয় অসম্ভব হয়ে পড়বে। রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেও এখন ট্রাম্পের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। আমেরিকার মানুষ এখন বিভাজনের চেয়ে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা খুঁজছে, আর ফ্লোরিডার এই জরিপ সেই নতুন মেরুকরণেরই প্রথম বড় প্রমাণ।