ঢাকা অফিস • প্রকাশিত: ০১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৪:৫৯ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে চরিত্রের পরিবর্তন জরুরি বললেন ডা. শফিকুর রহমান

ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে চরিত্রের পরিবর্তন জরুরি বললেন ডা. শফিকুর রহমান

কুমিল্লার লাকসাম স্টেডিয়ামে আয়োজিত এক বিশাল নির্বাচনী জনসভায় জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আগামীর রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করেছেন। শুক্রবার সন্ধ্যায় কুমিল্লা-৯ আসনের এই জনসভায় তিনি স্পষ্টভাবে বলেন যে, যাদের চরিত্রের পরিবর্তন হয়নি, তাদের দিয়ে কোনোভাবেই একটি সমৃদ্ধ ও নতুন বাংলাদেশ গড়া সম্ভব নয়। যারা আজও ফ্যাসিবাদের আচরণ লালন করে এবং জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা ও সংস্কারের প্রকৃত দাবিকে উপেক্ষা করে, তারা প্রকৃতপক্ষে ফ্যাসিবাদমুক্ত সমাজ গড়ার যোগ্য নয়। রাজনৈতিক অঙ্গনে যখন নির্বাচনের আমেজ তুঙ্গে, তখন জামায়াত আমিরের এই মন্তব্য ক্ষমতার অংশীদারিত্ব এবং আদর্শিক লড়াইয়ের এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আগামী ১৩ তারিখ একটি নতুন ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ পাওয়ার জন্য দেশের ১৮ কোটি মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। একটি সত্যিকারে ফ্যাসিবাদমুক্ত রাষ্ট্র গঠন করতে হলে এমন নেতৃত্ব প্রয়োজন যাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার অদম্য সাহস রয়েছে। তিনি আত্মবিশ্বাসের সাথে উল্লেখ করেন যে, মহান আল্লাহর মেহেরবানিতে সেই সাহস ও ধৈর্য জামায়াতে ইসলামীর রয়েছে। দলের বিগত দিনের ত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, সাজানো সাক্ষী আর পাতানো আদালতের মাধ্যমে দফায় দফায় তাদের শীর্ষ নেতাদের হত্যা করা হয়েছে, কিন্তু জামায়াত কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেনি। দেশ ছেড়ে পালানোর সংস্কৃতিতে তারা বিশ্বাসী নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারা এই মাটির সন্তান হিসেবে সব সময় জনগণের পাশে ছিলেন এবং ভবিষ্যতেও থাকবেন।

বক্তব্যের এক পর্যায়ে বিএনপি ও তাদের বর্তমান কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করেন জামায়াত আমির। বর্তমানে বিভিন্ন স্থানে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের যে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, সেটির নাম নিয়ে কটাক্ষ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন যে, এক হাতে কার্ড দেওয়া আর অন্য হাতে মা-বোনের অসম্মান করা কি জনগণ বোঝে না? তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশের মানুষ এখন অনেক বেশি সচেতন। তারা এখন আর কেবল মৌখিক প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করে না। তিনি আরও বলেন, দেশের মায়েরা এখন প্রকাশ্যেই বলছেন যে তারা আর অনিরাপদ বাংলাদেশ চান না। তারা একটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল বাংলাদেশ চান যেখানে তাদের ইজ্জত ও অধিকার সুরক্ষিত থাকবে। ডা. শফিকুর রহমান দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, কেবল দাঁড়িপাল্লা প্রতীক এবং তার সঙ্গীরাই দেশে সেই কাঙ্ক্ষিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম।

দেশপ্রেম এবং বিদেশে অর্থ পাচারের প্রসঙ্গ টেনে তিনি রাজনৈতিক নেতাদের বিদেশে চিকিৎসা নেওয়া এবং সম্পদ গড়ার তীব্র নিন্দা জানান। তিনি বলেন, জামায়াত নেতাদের কোনো বিদেশের মামা-খালু নেই কিংবা কোনো বেগমপাড়া নেই। তাদের একমাত্র ঠিকানা এই প্রিয় বাংলাদেশ। অথচ দেখা যায় যে, দেশের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সামান্য হাঁচি-কাশি হলেই তারা চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাড়ি জমান। দেশের প্রতি বা এদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি তাদের কোনো আস্থা নেই। এই ধরনের নেতাদের কাছে বাংলাদেশ কেবল টাকা কামানোর মেশিন ছাড়া আর কিছুই নয়। জনগণের রক্তঘামানো টাকা লুট করে যারা বিদেশে পাচার করে এবং সন্তানদের বিদেশের উন্নত পরিবেশে পড়ায়, তাদের মুখে দেশপ্রেমের কথা মানায় না বলে তিনি মন্তব্য করেন। প্রকৃত দেশপ্রেমিক হতে হলে তা কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে, কেবল সুন্দর বক্তৃতায় নয়।

কুমিল্লা-৯ আসনে ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী ও কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ছৈয়দ এ কে এম সরওয়ার উদ্দীন ছিদ্দীকির সভাপতিত্বে এই জনসভায় আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা বক্তব্য রাখেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এ টি এম মাছুম এবং কুমিল্লা-১০ আসনের প্রার্থী মুহাম্মদ ইয়াছিন আরাফাত। জনসভায় একটি বিশেষ আকর্ষণ ছিল জাতীয় নাগরিক পার্টির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও কুমিল্লা-৪ আসনের প্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহর উপস্থিতি। এ ছাড়া ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম এবং কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা জামায়াতের আমির মুহাম্মদ শাহজাহানও তাদের বক্তব্যে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের গুরুত্ব তুলে ধরেন।

বক্তারা বলেন, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে যারা প্রাণ দিয়েছেন, তাদের সেই রক্তের ঋন শোধ করতে হলে একটি দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থীরা দাবি করেন যে, বর্তমান সময়ে যে রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি হয়েছে, সেখানে ত্যাগী ও পরীক্ষিত দেশপ্রেমিকদেরই জয়ী করা উচিত। কুমিল্লার এই জনসভাকে কেন্দ্র করে পুরো লাকসাম ও মনোহরগঞ্জ এলাকায় ব্যাপক উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেছে। জনসভায় উপস্থিত সাধারণ মানুষ ও কর্মীদের উদ্দেশ্যে ডা. শফিকুর রহমান আহ্বান জানান যেন তারা ভোটের দিন পর্যন্ত সজাগ থাকেন এবং যেকোনো ধরনের ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকেন। তিনি মনে করেন, মানুষের দোয়া এবং সমর্থন থাকলে এবার দেশে একটি বড় ধরনের গুণগত পরিবর্তন আসবে।

সার্বিকভাবে লাকসামের এই জনসভা ছিল জামায়াতের শক্তি প্রদর্শনের পাশাপাশি বিরোধী দলগুলোর প্রতি একটি শক্ত বার্তা। ক্ষমতার পালাবদলে কেবল মুখ বদল নয়, বরং রাজনৈতিক সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তনের যে ডাক ডা. শফিকুর রহমান দিয়েছেন, তা আসন্ন নির্বাচনে ভোটারদের সিদ্ধান্তের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ফ্যামিলি কার্ড বা অন্যান্য জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের নামে যে প্রচার চলছে, তার বিপরীতে জামায়াতের ‘নিরাপদ বাংলাদেশ’ স্লোগানটি সাধারণ মানুষের মাঝে কতটা জনপ্রিয়তা পায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত আমিরের এই তীক্ষ্ণ বক্তব্য আগামী দিনের নির্বাচনী লড়াইকে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক করে তুলবে।