রাজধানীর কারওয়ান বাজারের বিডিবিএল ভবনে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ অনুষ্ঠানে সম্প্রতি উঠে এল দেশের আগামীর রাজনৈতিক গতিপথের এক চাঞ্চল্যকর পূর্বাভাস। ইনোভেশন কনসাল্টিং নামক বেসরকারি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান তাদের পিপলস ইলেকশন পালস সার্ভে বা পেপস-এর তৃতীয় রাউন্ডের ফলাফল প্রকাশের মাধ্যমে দেখিয়েছে যে, নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপির প্রতি জনসমর্থন ততই দৃঢ় ও সংহত হচ্ছে। বিআরএআইএন ও ভয়েস ফর রিফর্ম নামক দুটি নাগরিক প্ল্যাটফর্মের সহযোগিতায় পরিচালিত এই জনমত জরিপটি বর্তমান অস্থির ও পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। জরিপের বিস্তারিত তথ্যানুসারে, দেশের প্রায় ৪৭ শতাংশের বেশি মানুষ এখন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখার সম্ভাবনা ব্যক্ত করেছেন। এই পরিসংখ্যানটি কেবল একটি সংখ্যামাত্র নয়, বরং এটি দেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যের যে পরিবর্তন ঘটছে, তার একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করছে।
জরিপটির কার্যপদ্ধতি ও প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, গত বছরের মার্চ মাসে যখন পেপস-এর প্রথম রাউন্ডের ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছিল, তখন রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল ভিন্নতর। এরপর সেপ্টেম্বরে দ্বিতীয় রাউন্ডের ফলাফলের পর বর্তমান তৃতীয় রাউন্ডের ফলাফল মূলত একটি ধারাবাহিক পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরেছে। এবারের জরিপটি পরিচালনা করা হয়েছে চলতি জানুয়ারি মাসের ১৬ থেকে ২৭ তারিখ পর্যন্ত। দেশের ৬৪টি জেলার শহর ও গ্রামাঞ্চল থেকে বাছাই করা ৫ হাজার ১৪৭ জন উত্তরদাতার সরাসরি ও টেলিফোনিক সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। ইনোভেশন কনসাল্টিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুবাইয়াৎ সারওয়ার যখন এই ফলাফল উপস্থাপন করেন, তখন তিনি উল্লেখ করেন যে, ভোটার উপস্থিতি, গণভোটের প্রতি জনমত, দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সম্ভাবনা এবং সাধারণ মানুষের ভোট দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত—এই ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে মানুষের মতামত নেওয়া হয়েছে।
জরিপের অন্যতম আকর্ষণীয় দিক হলো ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পছন্দের তালিকায় ব্যক্তিবর্গের অবস্থান। ফলাফলে দেখা গেছে, ৪৭ দশমিক ৬ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হবেন তারেক রহমান। এর বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান ২২ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে আলোচিত তরুণ নেতৃত্ব নাহিদ ইসলামের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেছেন ২ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ। তবে একটি বড় অংশ অর্থাৎ ২২ দশমিক ২ শতাংশ উত্তরদাতা এখনও নিশ্চিত করে বলতে পারেননি যে, ভবিষ্যতে কার হাতে দেশের শাসনভার ন্যস্ত হতে যাচ্ছে। এই বিশাল অংশের সিদ্ধান্তহীনতা নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলে একটি বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রতিবেদনটি আরও বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছে যে, বিএনপির এই ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার পেছনে কয়েকটি বড় প্রভাবক কাজ করেছে। বিশেষ করে তারেক রহমানের দেশে ফেরার সম্ভাবনা এবং দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রয়াণের পর দলটির প্রতি সাধারণ মানুষের সহানুভূতি ও আস্থা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে আগে যারা ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে দোটানায় ছিলেন, তাদের একটি বড় অংশ এখন সরাসরি বিএনপির পতাকাতলে এসে দাঁড়াচ্ছেন।
এলাকাভিত্তিক বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা যাচাই করতে গিয়ে জরিপটি একটি চমকপ্রদ তথ্য প্রকাশ করেছে। যদি আগামীকালই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তবে নিজ এলাকায় কোন দলের প্রার্থী জয়ী হতে পারেন—এমন প্রশ্নের জবাবে ৫২ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ বিএনপির প্রার্থীর কথা বলেছেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, পেপস-এর দ্বিতীয় রাউন্ডের তুলনায় তৃতীয় রাউন্ডে বিএনপিকে সম্ভাব্য বিজয়ী হিসেবে দেখার হার ৭ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধির হার মাত্র ১ দশমিক ১ শতাংশ। অর্থাৎ মাঠ পর্যায়ে বিএনপির অবস্থান অন্যান্য দলের তুলনায় অনেক দ্রুত শক্তিশালী হচ্ছে। এই জনসমর্থনের উৎস বিশ্লেষণ করতে গিয়ে প্রতিবেদনে দেখা গেছে, রাজনৈতিক অঙ্গনের এক মেরুকরণ ঘটছে। আগে যারা জামায়াতে ইসলামী কিংবা জাতীয় নাগরিক পার্টির পক্ষে ছিলেন, তাদের মধ্য থেকে একটি বড় অংশ এখন বিএনপির দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। এমনকি ক্ষমতাচ্যুত দল আওয়ামী লীগের সমর্থকদের একটি বড় অংশও এখন বিএনপির প্রার্থীদের ভোট দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন বলে জরিপে উঠে এসেছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত দল আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। নিবন্ধন স্থগিত থাকায় এবং দলীয় কার্যক্রমের ওপর আইনি বা রাজনৈতিক বিধিনিষেধ থাকায় দলটির বিশাল ভোটব্যাংক এখন একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। পেপস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের পুরনো ভোটারদের প্রায় ৩২ দশমিক ৯ শতাংশ এখন বিএনপিকে ভোট দেওয়ার কথা ভাবছেন। অন্যদিকে ১৩ দশমিক ২ শতাংশ ভোটার জামায়াতের দিকে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে আওয়ামী লীগের এক বড় অংশ অর্থাৎ ৪১ দশমিক ৩ শতাংশ ভোটার এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি। এই সিদ্ধান্তহীন ভোটাররা শেষ পর্যন্ত কোন দিকে হেলে পড়েন, তার ওপর নির্বাচনের চূড়ান্ত সমীকরণ নির্ভর করছে। প্রতিবেদনে এই প্রবণতাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হয়েছে কারণ জামায়াত বা এনসিপির তুলনায় বিএনপিই মূলত এই ঘরহারা ভোটারদের প্রথম পছন্দে পরিণত হয়েছে।
বিএনপির এই ভোট বৃদ্ধির অভ্যন্তরীণ বিন্যাস আরও সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, দলটির সম্ভাব্য ৫২ দশমিক ৮ শতাংশ ভোটের মধ্যে একটি বিশাল অংশ অর্থাৎ ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ এসেছে আগে যারা সিদ্ধান্তহীন বা অনির্ধারিত ছিলেন তাদের কাছ থেকে। বিপরীতে জামায়াতের সম্ভাব্য ৩১ শতাংশ ভোটের মধ্যে ১৪ দশমিক ১ শতাংশ এসেছে এই একই ধরনের অনিশ্চিত গোষ্ঠী থেকে। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গায় বিএনপি এখন অনেক বেশি এগিয়ে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, জামায়াত সমর্থকদের মধ্যে ভোটের পছন্দ প্রকাশ না করার এক ধরনের প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। বিএনপির ভোটব্যাংক যেখানে স্থিতিশীল ও উর্ধ্বমুখী, সেখানে জামায়াতের ভোটব্যাংকে কিছুটা অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার কারণে এনসিপির কিছু ভোট সরাসরি বিএনপির দিকে স্থানান্তরিত হয়েছে বলে জরিপকারীরা ইঙ্গিত দিয়েছেন। এটি প্রমাণ করে যে, বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের বা মেরুকরণের প্রেক্ষাপটে বিএনপির অবস্থান এখন অনেক বেশি সুবিধাজনক।
নির্বাচনের দিনেই আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যা হলো সংবিধানের মৌলিক সংস্কারের প্রশ্নে গণভোট। জুলাই সনদ অনুসারে এই গণভোটের আয়োজন করা হচ্ছে এবং পেপস প্রতিবেদনে এই বিষয়েও জনমত যাচাই করা হয়েছে। জরিপের উত্তরদাতাদের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ গণভোটে হ্যাঁ-এর পক্ষে অর্থাৎ সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষে সায় দিয়েছেন। তবে ২২ শতাংশ মানুষ এখনও গণভোটের বিষয়বস্তু সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখেন না। সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থানভেদে গণভোট সম্পর্কে সচেতনতার এই তারতম্য প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের কাছে সংস্কারের বার্তা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এখনও কিছুটা কাজ করার সুযোগ রয়েছে। তবুও বিশাল একটি অংশের সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নেওয়া দেশের রাজনৈতিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকেই প্রতিধ্বনিত করে।
সার্বিকভাবে ইনোভেশন কনসাল্টিংয়ের এই জরিপটি বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। একদিকে দীর্ঘদিনের ক্ষমতার পালাবদল, অন্যদিকে নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ও জনমতের মেরুকরণ—সব মিলিয়ে এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে দেশ। বিএনপির প্রতি ক্রমবর্ধমান জনসমর্থন এবং তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখার এই প্রবল আকাঙ্ক্ষা রাজনৈতিক অঙ্গনে দলটির কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত দিচ্ছে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের বিশাল সিদ্ধান্তহীন ভোটার গোষ্ঠী এবং অন্যান্য ছোট দলগুলোর ভোট বিএনপির দিকে সরে আসা দলটির জয়ের সম্ভাবনাকে আরও পোক্ত করছে। এই জরিপের ফলাফল যদি আগামী নির্বাচনে প্রতিফলিত হয়, তবে বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। এখন দেখার বিষয়, আগামী কয়েক দিনে রাজনৈতিক দলগুলো এই জনমতকে কীভাবে ধারণ করে এবং শেষ পর্যন্ত ভোটাররা ব্যালট বাক্সে তাদের রায়ের চূড়ান্ত প্রতিফলন কীভাবে ঘটান। বাংলাদেশের আগামীর ভাগ্য নির্ধারণী এই নির্বাচনের দিকে এখন তাকিয়ে আছে সারা বিশ্ব।