এখন সময় ডেস্ক • প্রকাশিত: ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ১০:১৬ পিএম • অনলাইন সংস্করণ

পারস্য উপসাগরে যুদ্ধের দামামা: আকাশপথে মহাবিপর্যয়

পারস্য উপসাগরে যুদ্ধের দামামা: আকাশপথে মহাবিপর্যয়

মধ্যপ্রাচ্যের নীল আকাশে এখন ধবধবে সাদা মেঘের বদলে উড়ছে যুদ্ধের কালো মেঘ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি মাত্র হুঁশিয়ারি এবং পারস্য উপসাগরের দিকে আমেরিকার বিশাল নৌবহরের অগ্রযাত্রা পুরো বিশ্বের বিমান চলাচল ব্যবস্থাকে এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান এই চরম উত্তেজনার জেরে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ এখন বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। এর ফলে লুফথানসা, কেএলএম রয়্যাল ডাচ এয়ারলাইন্স এবং এয়ার ফ্রান্সের মতো বিশ্বের বাঘা বাঘা বিমান সংস্থাগুলো ওই অঞ্চলে তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

ফ্ল্যাশব্যাক ও বর্তমান প্রেক্ষাপট:

সংকটটির সূত্রপাত মূলত গত বছরের শেষদিকে ইরানে শুরু হওয়া সরকারবিরোধী বিশাল গণবিক্ষোভকে কেন্দ্র করে। বিক্ষোভকারীদের ওপর ইরান সরকারের কঠোর দমন-পীড়ন এবং একের পর এক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ঘটনায় বিশ্বজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত আক্রমণাত্মক অবস্থান গ্রহণ করেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ইরান যদি তার নাগরিকদের ওপর এই নৃশংসতা বন্ধ না করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপে দ্বিধা করবে না। যদিও গত সপ্তাহে একবার হামলার পরিকল্পনা থেকে ট্রাম্প পিছিয়ে এসেছিলেন বলে গণমাধ্যমে খবর এসেছিল, কিন্তু গত কয়েক দিনের ঘটনাবলি বলছে পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।

আকাশপথে অচলবস্থা ও ফ্লাইট বাতিল:

শনিবার ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, মার্কিন নৌবহরের অবস্থানের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এয়ার ফ্রান্স এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতির উচ্চ ঝুঁকি বিবেচনা করে ২৩ এবং ২৪ জানুয়ারি তাদের দুবাইগামী সব ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। অন্যদিকে, নেদারল্যান্ডসের জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা কেএলএম রয়্যাল ডাচ এয়ারলাইন্স আরও এক ধাপ এগিয়ে দুবাই, রিয়াদ, দাম্মাম এবং তেলআবিবে তাদের ফ্লাইট অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছে। সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের বিমানগুলো এখন থেকে ইরান, ইরাক এবং ইসরায়েলের আকাশসীমা সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলবে। এই সিদ্ধান্তের ফলে ইউরোপের সাথে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হওয়ার পথে।

কেবল ইউরোপীয় সংস্থাই নয়, উত্তর আমেরিকার ইউনাইটেড এয়ারওয়েস এবং এয়ার কানাডাও ইসরায়েল ও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে তাদের ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ করে দিয়েছে। বিমান চলাচল বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী যুদ্ধাবস্থায় কোনো বাণিজ্যিক বিমান যদি আক্রান্ত হয়, তবে তার দায়ভার এবং বীমার ঝুঁকি নেওয়া এয়ারলাইন্সগুলোর পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে ২০২০ সালে তেহরানের আকাশে ইউক্রেনীয় বিমান ভূপাতিত হওয়ার মর্মান্তিক স্মৃতি এখনো বিমান সংস্থাগুলোর মনে দগদগে। তাই যেকোনো ধরনের ঝুঁকি এড়াতে তারা এই কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে।

আঞ্চলিক অর্থনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব:

এই আকাশপথ অবরোধের প্রভাব কেবল ভ্রমণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। দুবাই, রিয়াদ এবং তেলআবিবের মতো ব্যবসায়িক কেন্দ্রগুলোতে বিমান চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। হাজার হাজার আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী এবং পর্যটক বিভিন্ন বিমানবন্দরে আটকা পড়েছেন। অনেককে বিকল্প পথে দীর্ঘ সময় ব্যয় করে গন্তব্যে পৌঁছাতে হচ্ছে, যার ফলে টিকিটের দাম কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ট্রাম্পের এই ‘কড়া নজরদারির’ বার্তা মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ বা স্নায়ুযুদ্ধের অংশ। আমেরিকা চায় ইরানকে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে কোণঠাসা করতে। পারস্য উপসাগরে নৌবহর পাঠানোর মাধ্যমে ওয়াশিংটন তেহরানকে এই বার্তাই দিচ্ছে যে, যেকোনো সময় সামরিক হামলা শুরু হতে পারে। অন্যদিকে, তেহরানও তাদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করে রেখেছে, যা এই অঞ্চলের উত্তেজনাকে স্ফুটনাঙ্কে পৌঁছে দিয়েছে।

জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা:

মধ্যপ্রাচ্য হলো বিশ্বের জ্বালানি তেলের প্রধান উৎস। পারস্য উপসাগর বা হরমুজ প্রণালীতে কোনো ধরনের সামরিক সংঘাত শুরু হলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বার্তার পর থেকেই অপরিশোধিত তেলের বাজারে অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যদি সত্যিই কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ মন্দা নেমে আসার আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।

ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা:

এখন সবার নজর হোয়াইট হাউসের দিকে। ডোনাল্ড ট্রাম্প কি সত্যিই ইরানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার নির্দেশ দেবেন, নাকি এটি কেবলই একটি চাপ সৃষ্টির কৌশল? আন্তর্জাতিক মহল বর্তমানে উভয় পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানাচ্ছে। জাতিসংঘ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি বলছে ভিন্ন কথা।

সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন নিস্তব্ধ কিন্তু থমথমে। যাত্রীবাহী বিমানের ইঞ্জিনের শব্দের বদলে সেখানে এখন কেবল যুদ্ধবিমানের মহড়া আর যুদ্ধের আশঙ্কার গুঞ্জন। বিমান সংস্থাগুলোর এই গণহারে ফ্লাইট বাতিল প্রমাণ করে যে, বিশ্ববাসী এখন একটি বড় ধরনের সংঘাতের কিনারে দাঁড়িয়ে আছে। আগামী কয়েক দিন এই অঞ্চলের জন্য অত্যন্ত সংকটাপন্ন হতে যাচ্ছে।