এখন সময় ডেস্ক • প্রকাশিত: ০৭ ডিসেম্বার ২০২৫, ০৬:২২ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন

পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন

দুই দশক ধরে ৫৮ বছর বয়সী মুহাম্মদ আবদুলরহমান তার স্ত্রী এবং মৌমাছির বাক্স নিয়ে ইসরায়েল-অধিকৃত পশ্চিম তীরের একটি প্রত্যন্ত পাহাড়ে বাস করতেন। কিন্তু গত মে মাসে, তার বাড়ি থেকে প্রায় ২০০ গজ দূরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা ক্যাম্প স্থাপন করে এবং আবদুলরহমানের বাড়িতে যাওয়ার রাস্তাটি নিয়ন্ত্রণ নেয়, ফলে তিনি আর ফিরতে পারেননি বলে জানান। এরপর ইসরায়েলি সেনারা তাকে এবং তার স্ত্রী সুহা আবদুলরহমানকে উচ্ছেদ করে দেয়।

যদিও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে যে আবদুলরহমান স্বেচ্ছায় চলে গেছেন, কিন্তু তিনি এখনো বাড়িতে ফিরতে পারেননি। গত মাসে একজন ইসরায়েলি আইনপ্রণেতার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, আবদুলরহমানের বাড়িটিকে বসতি স্থাপনকারীরা ধর্মীয় শিক্ষার স্থানে পরিণত করেছে।

গত মাসে পার্শ্ববর্তী বেতুনিয়া শহরে তার ভাইয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেওয়া আবদুলরহমান টেলিফোনে বলেন, "আমার সব স্মৃতি ওই বাড়িতে। তারা শুধু আমাদের জমিই চুরি করছে না, আমাদের মাটির সাথে যে শিকড় জড়িয়ে আছে, তাও কেটে ফেলতে চাইছে।"

আবদুলরহমান দম্পতি ছিলেন প্রথম দিকের ফিলিস্তিনিদের মধ্যে অন্যতম, যারা গত মে মাসে ইসরায়েলি সরকারের একটি সিদ্ধান্তের শিকার হন। ওই সিদ্ধান্তে পশ্চিম তীরের আরও ফিলিস্তিনি এলাকাকে ইহুদি বসতিতে পরিণত করার জন্য মানচিত্র নতুন করে আঁকা হয়েছিল। এটি ছিল কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় সম্প্রসারণ, যেখানে রামাল্লা শহরের পশ্চিমে আবদুলরহমানদের বাড়ির কাছে 'বেত হোরন নর্থ' সহ ২২টি গ্রাম ও এলাকাকে বসতির জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়। এটি পশ্চিম তীরের উপর ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ আরও পাকাপোক্ত করার দীর্ঘমেয়াদী প্রচেষ্টার অংশ।

২০২২ সালে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর এবং ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের হামলার পর গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই প্রক্রিয়া আরও জোরদার হয়েছে। পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বেড়েছে, যা ইসরায়েলি পুলিশ মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়েছে। ইসরায়েল জঙ্গি দমনের নামে ব্যাপক সামরিক অভিযান চালিয়েছে, যার ফলে ফিলিস্তিনি শহরগুলিতে গোটা এলাকা উপড়ে ফেলা হয়েছে। ইতিহাসবিদ এবং গবেষকরা বলছেন, গত অর্ধশতকে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের এত বড় আকারের বাস্তুচ্যুতি আগে দেখা যায়নি।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বেশিরভাগই মনে করে, পশ্চিম তীরকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠন করাই ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের অবসানের চাবিকাঠি। তবে ১৯৬৭ সালে এলাকাটি দখলের পর থেকেই ইসরায়েল বসতি নির্মাণের মাধ্যমে সেখানে নিজেদের উপস্থিতি বাড়িয়ে চলেছে।

ইসরায়েলের স্থানীয় বসতি স্থাপনকারী কাউন্সিলের প্রধান ইসরায়েল গঞ্জ, যিনি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়তা করেছিলেন, তিনি জানান মে মাসের এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সরকার প্রক্রিয়াটিকে ত্বরান্বিত করতে চায়। গঞ্জ বলেন, "ধরুন ইসরায়েল রাষ্ট্র ৫০০ একর জমি হারাতে চায় না—তারা সেখানে একটি গ্রাম স্থাপন করে। এর মানে এই নয় যে ৫০০ একরের একটি শহর তৈরি হবে, কিন্তু একবার আপনি সেখানে গেলে, অন্য কেউ সেখানে থাকতে পারবে না।"

জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালত মনে করে, অধিকৃত পশ্চিম তীরের সমস্ত ইসরায়েলি বসতি আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে। ইসরায়েল অবশ্য এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে। মে মাসে অনুমোদিত ২২টি বসতির মধ্যে কিছু বসতি আগে থেকেই ছিল, তবে ইসরায়েলি আইন অনুসারে সেগুলোকে অবৈধ বলে মনে করা হতো। সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সেগুলোকে পূর্ববর্তী তারিখ থেকে বৈধতা দেওয়া হলো।

বসতি পর্যবেক্ষণকারী ইসরায়েলি অ্যাডভোকেসি গ্রুপ 'পিস নাও'-এর মতে, গত এক বছরে বসতি স্থাপনকারীরা রেকর্ড সংখ্যক আউটপোস্ট বা ছোট ক্যাম্প স্থাপন করেছে। শুধু গত ছয় মাসেই ৪০টিরও বেশি আউটপোস্ট তৈরি হয়েছে। মি. গঞ্জ বলেন, ২২টি বসতি স্থাপনের সরকারি পরিকল্পনাটি "ফিলিস্তিনিদের নগর বৃদ্ধি রোধ করা এবং ইসরায়েলি বসতিপূর্ণ এলাকাগুলিকে সংযুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে করা হয়েছে।" তিনি যোগ করেন, "উদাহরণস্বরূপ, বেত হোরন নর্থ রামাল্লার বিস্তারকে থামিয়ে দেবে।"

মুহাম্মদ আবদুলরহমান বলেছেন, তিনি তার বাড়ির জন্য লড়তে প্রস্তুত এবং ইসরায়েলি পুলিশ ও সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে অভিযোগ দায়ের করেছেন। তিনি বলেন, “এখন আবেগের সময় নয়। ইসরায়েলের দাবি যে এটি একটি আইনের শাসন মেনে চলা দেশ, সেটির পরীক্ষা করার সময় এসেছে।”