এখন সময় ডেস্ক • প্রকাশিত: ০৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৭:৩২ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

নির্বাচন ব্যবস্থা জাতীয়করণের পক্ষে ট্রাম্প

নির্বাচন ব্যবস্থা জাতীয়করণের পক্ষে ট্রাম্প

নির্বাচনী ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনার এক নজিরবিহীন আহ্বান জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত সোমবার সাবেক ডেপুটি এফবিআই ডিরেক্টর ড্যান বঙ্গিনোর পডকাস্টে অংশ নিয়ে তিনি বলেন যে রিপাবলিকানদের উচিত নির্বাচনের দায়িত্ব সরাসরি নিজেদের হাতে তুলে নেওয়া এবং এই প্রক্রিয়াটিকে জাতীয়করণ করা। স্টেটগুলোর কাছ থেকে ভোটাধিকার পরিচালনার ক্ষমতা ছিনিয়ে নেওয়ার এই প্রস্তাব মার্কিন রাজনীতিতে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ট্রাম্প তার বক্তব্যে জোর দিয়ে বলেন যে অন্তত ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে রিপাবলিকানদের উচিত নির্বাচনের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করা। তার মতে নির্বাচন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে হলে কেন্দ্রীয়ভাবে এই নিয়ন্ত্রণ জরুরি। তবে সমালোচকরা বলছেন এটি মার্কিন সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী।

ট্রাম্পের এই প্রস্তাবকে ডেমোক্র্যাটরা তাদের পূর্ববর্তী আশঙ্কার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। তারা অনেকদিন ধরেই সতর্ক করে আসছিলেন যে ট্রাম্প কঠোর নির্বাচনী আইন এবং জালিয়াতির তদন্তের দোহাই দিয়ে ভোটাধিকার ব্যবস্থার ওপর আঘাত হানতে পারেন। মার্কিন সংবিধানের প্রথম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সিনেটর এবং প্রতিনিধিদের নির্বাচনের সময় স্থান ও পদ্ধতি নির্ধারণের ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট স্টেটের আইনসভার ওপর ন্যস্ত। যদিও কংগ্রেস চাইলে ফেডারেল প্রবিধান পাস করতে পারে কিন্তু নির্বাচনের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় স্টেটগুলোর প্রাধান্যই স্বীকৃত। সুপ্রিম কোর্টও বিভিন্ন সময়ে ব্যাখ্যা দিয়েছে যে ভোটার নিবন্ধন, নির্বাচন তদারকি, জালিয়াতি রোধ এবং ভোট গণনার মতো বিষয়গুলো মূলত স্টেটগুলোর নিয়ন্ত্রণেই থাকবে।

সাদা বাড়ির মুখপাত্র অ্যাবিগেইল জ্যাকসন এই জাতীয়করণের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা না দিলেও জানিয়েছেন যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের নিরাপত্তা নিয়ে অত্যন্ত চিন্তিত। তিনি বলেন ট্রাম্প কংগ্রেসকে সেভ অ্যাক্ট পাসের জন্য চাপ দিচ্ছেন যাতে দেশজুড়ে অভিন্ন ফটো আইডি কার্ডের ব্যবহার নিশ্চিত করা যায় এবং বিনা কারণে মেইল-ইন ভোটিং বা ব্যালট হার্ভেস্টিংয়ের মতো ব্যবস্থাগুলো বন্ধ করা সম্ভব হয়। ট্রাম্পের এই অবস্থান এমন এক সময়ে সামনে এলো যখন বিচার বিভাগ বিভিন্ন স্টেটের ভোটার তালিকা হস্তান্তরের জন্য চাপ দিচ্ছে যা অনেক নির্বাচন কর্মকর্তার মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। সম্প্রতি জর্জিয়ার ফুলটন কাউন্টিতে এফবিআই-এর একটি অভিযান এবং সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ নির্বাচনী সরঞ্জাম জব্দ করার ঘটনা এই উত্তাপকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ওই অভিযানে ডিরেক্টর অফ ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স তুলসী গ্যাবার্ডের উপস্থিতিও অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

পডকাস্টে ট্রাম্প সরাসরি জর্জিয়ার সেই অভিযানের প্রসঙ্গ টেনে দাবি করেন যে অনেক স্টেটে তিনি জয়ী হলেও ফলাফল উল্টো দেখানো হয়েছে। তিনি ইঙ্গিত দেন যে খুব শীঘ্রই জর্জিয়া থেকে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য বেরিয়ে আসবে। উল্লেখ্য যে ২০২০ সালের নির্বাচনে ব্যাপক জালিয়াতির যে দাবি ট্রাম্প করে আসছেন তার স্বপক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো শক্তিশালী প্রমাণ আদালতে গৃহীত হয়নি। তবুও কংগ্রেসে তার অনুসারীরা মেগা অ্যাক্ট নামক একটি বিল উত্থাপন করেছেন যেখানে মেল-ইন ভোটিং এবং র‍্যাঙ্কড চয়েস ভোটিং নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এদিকে বিচার বিভাগ ট্রাম্পের এই প্রচেষ্টায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত সপ্তাহে ইউএস ডিস্ট্রিক্ট বিচারক কলিন কলার-কোটেলি ট্রাম্পের ২০২৫ সালের একটি নির্বাহী আদেশের কার্যকারিতা স্থগিত করে দিয়েছেন। ওই আদেশে ভোটার নিবন্ধনের সময় নাগরিকত্বের প্রমাণ চাওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। বিচারক তার রায়ে স্পষ্ট করে বলেছেন যে সংবিধান প্রণেতারা নির্বাচনের নিয়ম পরিবর্তনের ক্ষমতা কোনোভাবেই প্রেসিডেন্টের হাতে ন্যস্ত করেননি। তিনি উল্লেখ করেন যে এই ক্ষমতা মূলত স্টেট এবং বিশেষ ক্ষেত্রে কংগ্রেসের। প্রেসিডেন্টের একক কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার এখতিয়ার এখানে নেই।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এই বক্তব্য কেবল একটি রাজনৈতিক বিতর্ক নয় বরং এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কাঠামোর ওপর একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আমেরিকার সংবিধান রচয়িতারা খুব ভেবেচিন্তেই নির্বাচনের ক্ষমতা স্টেটগুলোর হাতে ছেড়ে দিয়েছিলেন যাতে কোনো একজন কেন্দ্রীয় শাসক পুরো নির্বাচন ব্যবস্থাকে নিজের স্বার্থে কুক্ষিগত করতে না পারেন। ট্রাম্প যখন ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নির্বাচনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার কথা বলেন তখন তিনি আসলে সেই আড়াইশ বছরের পুরোনো কাঠামোর পরিবর্তন চাইছেন।

মার্কিন নির্বাচন ব্যবস্থা মূলত বিকেন্দ্রীকৃত। প্রতিটি স্টেটের নিজস্ব আইন ও পদ্ধতি রয়েছে যা স্থানীয় মানুষের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এখন যদি রিপাবলিকান পার্টি বা কেন্দ্রীয় সরকার এই ক্ষমতা সরাসরি গ্রহণ করে তবে সেটি হবে স্টেটগুলোর স্বায়ত্তশাসনের ওপর চরম আঘাত। এর ফলে ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে মেইল-ইন ভোটিং বা আগাম ভোটের মতো সুবিধাগুলো যা সাধারণ মানুষের ভোট দানকে সহজ করে দিয়েছিল সেগুলো বন্ধ করার প্রস্তাব প্রান্তিক ভোটারদের নির্বাচন থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

তবে ট্রাম্প শিবিরের যুক্তিও ফেলে দেওয়ার মতো নয়। তারা মনে করেন বর্তমান ব্যবস্থায় অনেক ফাঁকফোকর রয়েছে যার সুযোগ নিয়ে অনিয়ম করা সম্ভব। জাতীয় পরিচয়পত্রের বাধ্যতামূলক ব্যবহার বা নির্দিষ্ট নিয়মে ভোট প্রদানের দাবিগুলো নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি প্রক্রিয়া হতে পারে। কিন্তু সমস্যাটা তৈরি হচ্ছে যখন এই পরিবর্তনগুলো সংবিধানসম্মত উপায়ে না করে নির্বাহী ক্ষমতার মাধ্যমে করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আদালতের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণগুলো এটিই প্রমাণ করে যে আমেরিকার বিচার বিভাগ এখনও ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় সোচ্চার। পরশেষে ট্রাম্পের এই আক্রমণাত্মক অবস্থান আগামী নির্বাচনগুলোতে গভীর প্রভাব ফেলবে। একদিকে নিরাপত্তার দাবি আর অন্যদিকে নাগরিক অধিকার ও স্টেটের ক্ষমতা—এই দুইয়ের দ্বন্দ্বে আমেরিকার গণতন্ত্র এখন এক ঐতিহাসিক মোড়ে দাঁড়িয়ে। শেষ পর্যন্ত সংবিধানের প্রাধান্য বজায় থাকে নাকি ক্ষমতার নতুন কোনো মেরুকরণ ঘটে সেটাই দেখার বিষয়।