পরাজিত ও পলায়নকারী শক্তির সাথে আঁতাত করে একটি বিশেষ পক্ষ নির্বাচন নিয়ে নতুন করে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে বলে তীব্র অভিযোগ তুলেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার ২৯ জানুয়ারি নওগাঁয় আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আসন্ন নির্বাচন নিয়ে এই চাঞ্চল্যকর দাবি করেন। তার এই বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে এবং তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।
তারেক রহমান তার বক্তব্যে বলেন যে বিগত ১৫ বছর ধরে যারা দেশের ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছিল এবং জনগণের ভোটের অধিকার হরণ করেছিল সেই পক্ষটি জনরোষের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। কিন্তু বিপদ এখনো কাটেনি কারণ দেশে অবস্থানরত আরেকটি পক্ষ পর্দার আড়াল থেকে সেই পলায়নকারী শক্তির সাথে তলে তলে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছে। তার দাবি অনুযায়ী এই দুই পক্ষ গত দেড় দশক ধরে ভেতরে ভেতরে এক ছিল এবং এক পক্ষ কোনো প্রকৃত আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নেয়নি। বর্তমানে তারা আসন্ন নির্বাচনে একটি বড় ধরণের চক্রান্তের সুযোগ খুঁজছে যাতে জনগণের ম্যান্ডেটকে নস্যাৎ করা যায়।
নির্বাচনী জালিয়াতির কৌশল নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান ২০০৮ সালের নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে আনেন। তিনি বলেন যে সেই সময় এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল যেখানে ভোটকেন্দ্রের বাইরে দীর্ঘ লাইন থাকলেও ভেতরে সিল মারার মহোৎসব চলেছিল। ভোটাররা কেন্দ্রে গিয়েও ভোট দিতে পারেননি কারণ লাইন আর এগোচ্ছিল না। এই একই ধরণের ছক আবারও কষা হচ্ছে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তিনি দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে উদ্দেশ্য করে বলেন যে কোনোভাবেই এবার বাক্স ভরাট করতে দেওয়া যাবে না। তিনি ভোর থেকেই কেন্দ্রে উপস্থিত থাকা এবং ভোটগ্রহণ শেষে ফলাফল ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত কেন্দ্র পাহারা দেওয়ার কঠোর নির্দেশনা দেন।
নওগাঁর স্থানীয় সমস্যা ও উন্নয়নের রোডম্যাপ নিয়েও তারেক রহমান তার বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে নওগাঁ জেলা দেশের ধান উৎপাদনের প্রাণকেন্দ্র। কৃষকদের ভাগ্য উন্নয়নে তিনি কৃষি কার্ড প্রবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেন যার মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষকরা খুব সহজে এবং স্বল্প সুদে কৃষি ঋণ গ্রহণ করতে পারবেন। এছাড়াও এই এলাকায় প্রচুর আম উৎপাদিত হলেও পর্যাপ্ত হিমাগার না থাকায় কৃষকরা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন। তারেক রহমান ক্ষমতায় গেলে পর্যাপ্ত আধুনিক হিমাগার স্থাপন এবং নওগাঁর উৎপাদিত ফসল ও আম দ্রুত রাজধানীতে পরিবহনের জন্য নতুন রেললাইন স্থাপনের পরিকল্পনা ব্যক্ত করেন। তিনি মনে করেন এই উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা কেবল কৃষিপণ্য নয় বরং সাধারণ মানুষের যাতায়াতেও আমূল পরিবর্তন আনবে।
গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে তিনি আবেগঘন বক্তব্য দেন। তিনি বলেন যে যারা দীর্ঘ সময় ধরে ভোটাধিকার হরণ করেছিল তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে অজস্র মানুষ প্রাণ দিয়েছেন এবং বহু মানুষ চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। এই শহীদদের রক্ত এবং পঙ্গু ব্যক্তিদের ত্যাগ যেন বৃথা না যায় সেজন্য ১২ ফেব্রুয়ারি সবাইকে দলে দলে কেন্দ্রে গিয়ে গণতন্ত্রের পক্ষে রায় দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন যে ভোটের মাধ্যমেই দেশের সব ষড়যন্ত্রের মোক্ষম জবাব দিতে হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন তারেক রহমানের এই বক্তব্য মূলত একটি আগাম সতর্কতা। তিনি তার বক্তৃতায় যেমন একদিকে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তেমনি অন্যদিকে তার দলের সাংগঠনিক শক্তিকে কেন্দ্র পাহারার কাজে নিয়োজিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। নওগাঁর এই জনসভায় বিএনপি এবং তার অঙ্গ সংগঠনের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা একসুরে বলেন যে জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনাই এখন তাদের একমাত্র লক্ষ্য। তারা আরও বলেন যে কোনো অন্ধকার শক্তির চক্রান্তে পা না দিয়ে জনগণকে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।
নওগাঁর জনসভার এই বার্তা এখন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। তারেক রহমানের এই ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ এবং পলায়নকারী শক্তির সাথে গোপন আঁতাতের অভিযোগ আগামী নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক মেরুকরণকে আরও জটিল করে তুলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয় সরকার ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে কী পদক্ষেপ নেয়। তবে বিএনপির এই কঠোর অবস্থান এটাই ইঙ্গিত দেয় যে তারা এবারের নির্বাচনে কোনো ধরণের কারচুপি বা অনিয়ম মেনে নিতে রাজি নয়।