ঢাকা অফিস • প্রকাশিত: ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ০৯:০১ পিএম • অনলাইন সংস্করণ

নির্বাচন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আশঙ্কা মির্জা আব্বাসের: ভোট সুষ্ঠু হলে জয়ের প্রত্যাশা

নির্বাচন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আশঙ্কা মির্জা আব্বাসের: ভোট সুষ্ঠু হলে জয়ের প্রত্যাশা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণার প্রথম দিনে মালিবাগের শান্তিবাগ এলাকায় গণসংযোগকালে বড় ধরণের অভিযোগ তুলেছেন ঢাকা-৮ আসনের বিএনপির প্রার্থী এবং দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। বৃহস্পতিবার নির্বাচনি প্রচারণায় নেমে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, সরকারের একটি নির্দিষ্ট মহল পরিকল্পিতভাবে বিশেষ কিছু প্রার্থীকে জয়ী করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায় থেকে যখন কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থীর জয়ী হওয়ার আগাম ইঙ্গিত দেওয়া হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই বোঝা যায় তাদের জয়ী করতে নেপথ্যে নানা তৎপরতা চালানো হচ্ছে। মির্জা আব্বাস দাবি করেন, তার কাছে এমন অনেক তথ্য ও প্রমাণ রয়েছে যা দিয়ে সরকারের এই হস্তক্ষেপের বিষয়টি নিশ্চিত করা সম্ভব।

সকাল থেকেই শাহজাহানপুর পারিবারিক কবরস্থানে বাবা-মায়ের কবর জিয়ারতের মাধ্যমে দিনের কর্মসূচি শুরু করেন বিএনপির এই হেভিওয়েট প্রার্থী। এরপর নিজ বাসভবনে দোয়া মাহফিল শেষে দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে মাঠে নামেন তিনি। মালিবাগ, শান্তিবাগ এবং পুরাতন রমনা থানা জামে মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় গণসংযোগের সময় সাধারণ মানুষের ব্যাপক সাড়া লক্ষ্য করা গেছে। নেতাকর্মীদের গগণবিদারী স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে এলাকা। সেখানে মির্জা আব্বাস বলেন, নির্বাচনের জয়-পরাজয় নিয়ে তিনি কখনোই নিরাশ হন না। অতীতে প্রতিটি সুষ্ঠু নির্বাচনে তিনি জয়ী হয়েছেন এবং এবারও যদি মানুষ নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারে, তবে ইনশাআল্লাহ ধানের শীষেরই জয় হবে।

তবে নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে নিজের গভীর উদ্বেগের কথা লুকিয়ে রাখেননি তিনি। মির্জা আব্বাস বলেন, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে এক ধরণের ভয় কাজ করছে। সরকারের একটি অংশ বিশেষ কিছু প্রার্থীকে পরাজিত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে পারে। এর ফলে বিএনপি বা তার ব্যক্তিগত ফলাফলে কতটা প্রভাব পড়বে তা এখনই বলা না গেলেও, ষড়যন্ত্রের চেষ্টা যে চলছে সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, প্রশাসনের একটি বড় অংশ বিশেষ প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করছে এমন সুনির্দিষ্ট তথ্য তার হাতে আছে, যা সময়মতো প্রমাণসহ প্রকাশ করা হতে পারে।

নির্বাচনি প্রতিদ্বন্দ্বীর পক্ষ থেকে আসা ব্যক্তিগত আক্রমণ বা কটু মন্তব্যের বিষয়ে মির্জা আব্বাস অত্যন্ত ধৈর্যশীল ও রাজনৈতিক শিষ্টাচারপূর্ণ জবাব দিয়েছেন। তিনি বলেন, অনেকে তাকে নিয়ে শিষ্টাচারবহির্ভূত ভাষায় কথা বলছেন, কিন্তু তার বয়স ও রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সেইসব কথার প্রত্যুত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। তাকে ইচ্ছা করে উত্তেজিত বা রিঅ্যাক্ট করানোর চেষ্টা করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, রিঅ্যাক্ট করার বয়স তার পার হয়ে গেছে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর মন্তব্যের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি অত্যন্ত কৌশলী ভঙ্গিতে বলেন, ও আমার ছেলের চেয়েও ছোট। বাসায় আমার ছেলে যেমন মাঝে মাঝে দুষ্টুমি করে, ওকেও আমি সেভাবেই দেখছি। বড়দের অবস্থান থেকে ছোটদের দুষ্টুমিকে তিনি গুরুত্ব দিতে চান না।

প্রচারণার প্রথম দিনে শান্তিবাগে একটি উঠান বৈঠকের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল এবং সেখানে মঞ্চও তৈরি করা হয়। তবে বিএনপির একটি জরুরি সভায় যোগ দেওয়ার তাড়া থাকায় মির্জা আব্বাস সেই বৈঠকে দীর্ঘ সময় থাকতে পারেননি। তবে তিনি পায়ে হেঁটে এলাকার অলিগলিতে সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলেন এবং লিফলেট বিতরণ করেন। ভোটারদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, নির্বাচিত হলে এলাকার মানুষের সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করাই হবে তার প্রধান লক্ষ্য। তিনি শুধু গালভরা প্রতিশ্রুতি দেওয়ার জন্য কথা বলেন না, বরং মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী উন্নয়নমূলক কাজ করার অঙ্গীকার করেন।

ঢাকা-৮ আসনটি মূলত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৮ থেকে ১৩ নম্বর ওয়ার্ড এবং ১৯ থেকে ২১ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত। এই আসনের মধ্যে পুরানা পল্টন, শাহজাহানপুর, শান্তিনগর, নয়াপল্টন, বিজয়নগর, চামেলীবাগ ও রাজারবাগ পুলিশ লাইনের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো রয়েছে। এই আসনে মির্জা আব্বাসের বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জামায়াত সমর্থিত ১০-দলীয় জোটের প্রার্থী ও এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী। জোটের অভ্যন্তরীণ হিসাব-নিকাশের মধ্যেও মির্জা আব্বাসের প্রচারণায় নেতাকর্মীদের প্রবল মনোবল দেখা গেছে।

সবশেষে মির্জা আব্বাস আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সরকারের ভেতরে একদল ষড়যন্ত্রকারী সক্রিয় থাকলেও তৃণমূলের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের যে জোয়ার তিনি দেখছেন, তাতে সব চক্রান্ত নস্যাৎ হয়ে যাবে। মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের মনোবল ও জনগণের সমর্থনের ওপর ভিত্তি করেই তিনি নির্বাচনের শেষ পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। তিনি বিশ্বাস করেন, কোনো প্রশাসনিক ইঞ্জিনিয়ারিংই জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে স্থায়ী হতে পারবে না।

বিশ্লেষণমূলক পর্যবেক্ষণ: মির্জা আব্বাসের এই বক্তব্যগুলো আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের উত্তাপ ও অনিশ্চয়তার বহিঃপ্রকাশ। একদিকে জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাস এবং অন্যদিকে নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর আস্থাহীনতা—এই দুই মেরুর মধ্যে দাঁড়িয়েই বিএনপি প্রচারণা চালাচ্ছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের মন্তব্যের ওপর ভিত্তি করে যে সন্দেহের কথা তিনি বলেছেন, তা সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর প্রতি তার নমনীয় বা পিতৃতুল্য আচরণ মূলত ভোটারদের কাছে নিজেকে একজন পরিপক্ক ও স্থিতধী রাজনীতিবিদ হিসেবে তুলে ধরার একটি কৌশল। আগামী দিনগুলোতে এই আসনে নির্বাচনি লড়াই আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যেখানে মূল ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াতে পারে সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা।