সদ্য সমাপ্ত ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়লাভের পর নতুন সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তবে রাষ্ট্র পরিচালনার শুরুতেই দলটিকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে এক কঠিন বাস্তবতার। দেশের ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা, লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব দূর করাই এখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ২০৯টি আসনে জয় পায় বিএনপি। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৭৭টি আসন। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এটিই ছিল দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচন।
অর্থনীতির মন্থর গতি ও আইএমএফ-এর পূর্বাভাস
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন মাসে শেষ হওয়া অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি কমে ৩.৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অথচ বিগত দশকগুলোতে এই প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৬ থেকে ৭ শতাংশ। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতা এই নিম্নগতির প্রধান কারণ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তবে আইএমএফ আশা করছে, চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়ে ৪.৭ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
পোশাক খাতের নতুন শঙ্কা: এলডিসি উত্তরণ
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা তৈরি পোশাক খাত এখন এক সন্ধিক্ষণে। ২০২৬ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ যখন 'স্বল্পোন্নত দেশ' (LDC) থেকে 'উন্নয়নশীল দেশে' পদার্পণ করবে, তখন বিশ্ববাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার হারাবে। অক্সফোর্ড ইকোনমিক্স-এর মতে, এর ফলে রপ্তানি আয় প্রায় ১৪ শতাংশ কমে যেতে পারে। তখন ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো দেশগুলোর সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতায় নামতে হবে ঢাকাকে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত ও বাজার সংস্কার
কাউন্টারপয়েন্ট-এর সম্পাদক জাফর সোবহান এক ওয়েবিনারে বলেন,
"তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থানই ছিল গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম মূল চালিকাশক্তি। নতুন সরকার তরুণদের চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জনগণের এই আস্থার 'হানিমুন পিরিয়ড' খুব বেশি দিন স্থায়ী হবে না; দ্রুত ফলাফল দেখাতে হবে।"
এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউট আয়োজিত সেমিনারে আলোচকরা আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা আনতে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ কমানো এবং টাকার মান স্থিতিশীল করার ওপর জোর দিয়েছেন। নবনিযুক্ত অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এই সংকট কাটিয়ে উঠবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক: প্রত্যাশা ও বাস্তবতা
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা নতুন সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর এবং দুই দেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনায় সম্পর্কে যে তিক্ততা তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চলছে। ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশ পারস্পরিক স্বার্থে দিল্লির সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। তবে শেখ হাসিনাকে হস্তান্তরের দাবি সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি স্পর্শকাতর ইস্যু হিসেবে রয়ে গেছে।
তথ্যসূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট