২০২৬ সালের আসন্ন সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে এক অভাবনীয় পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের নীরবতা ভেঙে জামায়াতে ইসলামী এখন কেবল একটি ইসলামপন্থী শক্তি হিসেবে নয়, বরং একটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল, তথ্যনির্ভর এবং লক্ষ্যভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সিএনএন-নিউজ১৮ এবং মুম্বাই ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মানি কন্ট্রোলের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, জামায়াত এখন আর সারা দেশে নামকাওয়াস্তে উপস্থিতি দেখানোর পথে নেই। তাদের বর্তমান কৌশলের মূল ভিত্তি হলো ‘বুদ্ধিদীপ্ত সংহতি’, যেখানে তারা নির্দিষ্ট কিছু আসনে জয় নিশ্চিত করতে তাদের সমস্ত শক্তি ঘনীভূত করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের এই নতুন রণকৌশল অত্যন্ত বৈজ্ঞানিক। তারা ১৯৯১ এবং ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে এবং বর্তমানের অভ্যন্তরীণ জরিপের তথ্য মিলিয়ে ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৬২টি আসনকে অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বাকি ১৩৮টি আসন থেকে তারা তাদের জনবল এবং অর্থ সরিয়ে নিয়েছে যাতে নির্দিষ্ট আসনগুলোতে শক্তির কোনো অপচয় না হয়। এই কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে রাজধানী ঢাকা। প্রতীকী গুরুত্ব এবং জাতীয় রাজনীতির বয়ান তৈরির ক্ষমতার কারণে ঢাকার ২০টি আসনে দলটি জানপ্রাণ দিয়ে লড়ছে। তাদের এই প্রচারণা কেবল বক্তৃতা বা স্লোগানে সীমাবদ্ধ নেই; বরং ঘরে ঘরে গিয়ে জরিপ চালানো এবং নারী শাখা ও ইসলামী ছাত্রী সংস্থার মাধ্যমে ভোটারদের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করার মতো সুক্ষ্ম কাজও চলছে।
জামায়াতের এই নির্বাচনী প্রস্তুতির একটি বড় স্তম্ভ হলো প্রবাসীদের ভোট। দলটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ১৫ লাখ প্রবাসী ভোটারকে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিতে সংগঠিত করা হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে তাদের কর্মীরা অত্যন্ত সক্রিয়। ধারণা করা হচ্ছে, ভোটের দিন ফজরের নামাজের পরপরই জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা কেন্দ্রে পৌঁছে লাইনে আধিপত্য বিস্তার করবে, যা তারা অতীতে বিভিন্ন ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সফলভাবে প্রয়োগ করেছে। এছাড়া আর্থিক সক্ষমতার দিক থেকেও দলটি অভাবনীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। প্রতিটি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত আসনে ৫০ থেকে ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় করার সক্ষমতা তারা রাখছে বলে দাবি করা হয়েছে। এমনকি মিত্র দলগুলোর নির্বাচনী খরচও জামায়াত বহন করছে বলে জানা গেছে।
তবে এই কৌশলের একটি বিতর্কিত দিক হলো ভোটারদের তথ্য সংগ্রহ। অভিযোগ উঠেছে যে তৃণমূল কর্মীরা দরিদ্র ভোটারদের এনআইডি নম্বর এবং মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবের তথ্য সংগ্রহ করছে, যা ভোটের আগে নগদ অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যমে জনমতকে প্রভাবিত করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। অন্যদিকে, প্রধান বিরোধী দল বিএনপি বর্তমানে অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং বিদ্রোহী প্রার্থীর আশঙ্কায় কিছুটা বিপর্যস্ত। জামায়াতের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলোর দাবি অনুযায়ী, তারা নির্বাচনে ২০৫ থেকে ২১০টি আসন পাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যেখানে বিএনপি জোটের আসন সংখ্যা একশর নিচে নেমে আসতে পারে বলে তাদের ধারণা। এর পাশাপাশি একই দিনে গণভোটের সম্ভাবনা এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের রাষ্ট্রপতি হওয়ার গুঞ্জন রাজনৈতিক সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে।
জামায়াতের এই আকস্মিক ও শক্তিশালী উত্থানে প্রতিবেশী দেশ ভারত অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আশঙ্কা, বাংলাদেশে জামায়াত-প্রভাবিত কোনো সরকার গঠিত হলে তা ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। পশ্চিমবঙ্গ সংলগ্ন সীমান্ত এলাকাগুলোতে ইতিমধ্যে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। উত্তর ২৪ পরগনা, মালদা, মুর্শিদাবাদ এবং নদীয়ার মতো জেলাগুলোতে আদর্শিক প্রভাব বিস্তারের ঝুঁকি নিয়ে দিল্লি গভীরভাবে চিন্তিত। বিশেষ করে ভারতের অরক্ষিত সীমান্ত রুটগুলো ব্যবহার করে কোনো ধরনের নাশকতামূলক বা উগ্রপন্থী কার্যক্রমের বিস্তার ঘটে কি না, সেদিকে কড়া নজর রাখছে বিএসএফ এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালের নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের একটি সন্ধিক্ষণ হতে পারে। জামায়াতের এই ‘টার্গেট ওরিয়েন্টেড’ রাজনীতি প্রমাণ করে যে তারা প্রচলিত ধারার চেয়ে অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর এবং সুসংগঠিত। তবে বিপুল অর্থের ব্যবহার এবং দরিদ্র ভোটারদের তথ্য সংগ্রহের বিষয়টি একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের উদ্বেগও অমূলক নয়, কারণ দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শেষ পর্যন্ত এই বৈজ্ঞানিক কৌশল ভোটের মাঠে কতটা কার্যকর হয় এবং আন্তর্জাতিক মহলের প্রতিক্রিয়া কী হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।