দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি দাবি প্রচলিত যে বিএনপি আমলে বাংলাদেশ টানা পাঁচবার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। কিন্তু ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) দাপ্তরিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে ভিন্ন চিত্র ফুটে ওঠে। মূলত ১৯৯৫ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত টিআই দুর্নীতির সূচক নির্ধারণ করত আগের তিন বছরের তথ্যের গড়ে। বাংলাদেশ প্রথম এই সূচকে অন্তর্ভুক্ত হয় ২০০১ সালের জুন মাসে। সেই সময়ে বাংলাদেশে ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ সরকার। অর্থাৎ ২০০১ সালে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার দায়ভারটি মূলত ১৯৯৮ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত চলা আওয়ামী শাসনের আমলনামা। ১০-এর মধ্যে তখন বাংলাদেশের স্কোর ছিল মাত্র ০.৪।
২০০১ সালের শেষ দিকে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর দুর্নীতির এই সূচকে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে শুরু করে। বিএনপি সরকারের মাত্র ১০ মাসের মাথায় বাংলাদেশের স্কোর ০.৪ থেকে বেড়ে ১.২-এ উন্নীত হয়। এর পরবর্তী বছরগুলোতে এই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত ছিল। ২০০৩ সালে স্কোর বেড়ে ১.৩ এবং ২০০৪ সালে তা ১.৫-এ পৌঁছায়। ২০০৫ সালে স্কোর হয় ১.৭ এবং ২০০৬ সালে বিএনপি মেয়াদের শেষে এটি ২.০-এ দাঁড়ায়। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে বিএনপি আমলে বাংলাদেশ দুর্নীতির চ্যাম্পিয়ন তকমা থেকে মুক্ত হয়ে ক্রমান্বয়ে ভালো অবস্থানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।
অন্যদিকে বিগত ১৫-১৬ বছরের আওয়ামী লীগ শাসনামলে দুর্নীতির এক নতুন ও ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে। এই সময়ে দেশ থেকে প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার করা হয়েছে। ব্যাংকিং খাত থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। বিদেশের মাটিতে তৈরি হয়েছে ‘বেগম পাড়া’র মতো সম্পদ। এমনকি আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত পানামা পেপারসেও ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠদের নাম উঠে এসেছে। ভৌত অবকাঠামো নির্মাণে অস্বাভাবিক ব্যয় এবং ‘মাসের রাস্তা’র মতো নিম্নমানের কাজের ইতিহাস তৈরি হয়েছে এই আমলেই। ইতিহাস সবসময় সত্যকে আড়াল করে রাখে না এবং বর্তমানের পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে কারা দেশের সম্পদ রক্ষা করেছে আর কারা লুটে নিয়েছে।
পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়ই তথ্যের অপব্যাখ্যা দিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে। টিআই-এর তৎকালীন সূচক নির্ধারণ পদ্ধতিটি বর্তমান প্রজন্মের কাছে পরিষ্কার না থাকায় ‘চ্যাম্পিয়ন’ তকমাটি ভুলভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। প্রাপ্ত উপাত্তের নিবিড় বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, বিএনপি আমলে দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে উন্নতি করেছে, যা তৎকালীন সরকারের প্রশাসনিক নজরদারির সুফল হিসেবেই প্রতীয়মান হয়।