ঢাকা অফিস • প্রকাশিত: ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৭:৪৫ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

দীর্ঘ ১৮ মাস পর সচল ঢাকা-আগরতলা-কলকাতা বাস রুট

দীর্ঘ ১৮ মাস পর সচল ঢাকা-আগরতলা-কলকাতা বাস রুট

দীর্ঘ দেড় বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘ঢাকা-আগরতলা-কলকাতা’ আন্তর্জাতিক বাস পরিষেবা পুনরায় চালু হয়েছে। মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে ঢাকার কমলাপুর বিআরটিসি বাস ডিপো থেকে ‘রয়েল মৈত্রী’র একটি বাস পরীক্ষামূলকভাবে আখাউড়া আন্তর্জাতিক ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট হয়ে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলায় প্রবেশ করে।

এর আগে গত শনিবার আগরতলার কৃষ্ণনগর বাস ডিপো থেকে একটি বাস পরীক্ষামূলকভাবে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল। এই বাস পরিষেবা পুনরায় চালুর ফলে দুই দেশের সাধারণ যাত্রী, বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারতের মানুষের দীর্ঘদিনের যাতায়াত কষ্ট লাঘব হতে যাচ্ছে।

আপাতত সপ্তাহে দুদিন, স্থিতিশীলতায় বাড়বে গতি

আগরতলা-ঢাকা-কলকাতা বাস সার্ভিসের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) ওয়ারিছ আলম ডিএস সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সতর্কতা হিসেবে সপ্তাহে দুই দিন পরীক্ষামূলকভাবে বাস চলাচল করবে। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্থিতিশীল হলে এবং যাত্রীদের চাহিদা বৃদ্ধি পেলে এটি সপ্তাহে তিন দিন বা তার বেশি করার পরিকল্পনা রয়েছে। মূলত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সাম্প্রতিক ভিসা জটিলতার কারণে এই জনপ্রিয় রুটটি দীর্ঘ ১৮ মাস বন্ধ ছিল।

১০০০ কিলোমিটারের সাশ্রয়: ভৌগোলিক গুরুত্ব

ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা এই পরিষেবা পুনরায় চালু হওয়াকে স্বাগত জানিয়েছেন। ভৌগোলিক দিক থেকে এই রুটের গুরুত্ব অপরিসীম:

ট্রেন পথ: আগরতলা থেকে গুয়াহাটি হয়ে ভারতের শিলিগুড়ি দিয়ে কলকাতা পৌঁছাতে প্রায় ১৫০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়।

বাস পথ (ঢাকা হয়ে): বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ঢাকা হয়ে কলকাতা পৌঁছাতে মাত্র ৫০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়।

অর্থাৎ, বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে যাতায়াত করলে যাত্রীদের প্রায় ১০০০ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ এবং প্রচুর সময় সাশ্রয় হয়।

বাস সার্ভিস চালুর নেপথ্যে ও প্রভাব

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে এই বাস পরিষেবা কেবল পরিবহনের মাধ্যম নয়, এটি দুই দেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের একটি ব্যারোমিটার হিসেবে কাজ করে।

১. পর্যটন ও চিকিৎসা খাতের পুনরুজ্জীবন:

দেড় বছর ধরে ভিসা জটিলতা এবং বাস বন্ধ থাকায় ভারতের ত্রিপুরা এবং পশ্চিমবঙ্গের পর্যটন ও চিকিৎসা খাত বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছিল। বাংলাদেশের রোগীরা উন্নত চিকিৎসার জন্য কলকাতা বা আগরতলা যান, আবার ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পর্যটকরা ঢাকা ও কক্সবাজার ভ্রমণে আসেন। এই রুটটি পুনরায় চালুর ফলে দুই দেশের পর্যটন ও সেবা খাত আবার চাঙ্গা হবে।

২. ব্যবসা-বাণিজ্যে ইতিবাচক প্রভাব:

ত্রিপুরার পরিবহনমন্ত্রী সুশান্ত চৌধুরী জানিয়েছেন, এই পরিষেবা ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা যারা সড়কপথে পণ্য আনা-নেওয়া বা স্যাম্পল নিয়ে যাতায়াত করেন, তাদের জন্য এই সংযোগ অত্যন্ত সাশ্রয়ী।

৩. কূটনৈতিক সম্পর্কের নতুন বার্তা:

২০২৪ সালের আগস্টের পর দুই দেশের সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, এই বাস সার্ভিস চালু হওয়াকে তার একটি ‘বরফ গলা’র লক্ষণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। মৈত্রী ও পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে এই ধরনের গণপরিবহন ব্যবস্থা চালু হওয়া প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের প্রয়োজনে রাষ্ট্রগুলো শেষ পর্যন্ত সহযোগিতার পথেই হাঁটে।

৪. ভিসা জটিলতার নিরসন প্রত্যাশা:

বাস চালু হলেও সাধারণ মানুষের বড় একটি অংশ এখনো ভারতীয় ভিসার অপেক্ষায় রয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বাস সার্ভিস নিয়মিত হলে হাই কমিশনগুলোর পক্ষ থেকেও ভিসা দেওয়ার প্রক্রিয়া আরও সহজতর করা হবে।

ঢাকা-আগরতলা-কলকাতা রুটে বাসের চাকা ঘোরা মানে কেবল ইঞ্জিনের গর্জন নয়, এটি দুই দেশের হাজারো মানুষের আবেগ ও প্রয়োজনের মিলনস্থল। রাজনৈতিক অস্থিরতা কাটিয়ে শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে এই সংযোগ দীর্ঘস্থায়ী হবে—এমনটাই প্রত্যাশা করছেন দুই তীরের মানুষ।