ঢাকা অফিস • প্রকাশিত: ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৬:২৪ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

তৃণমূল থেকে রাষ্ট্রনায়ক: তারেক রহমানের সংগ্রাম, সংকল্প ও আগামীর বাংলাদেশ

তৃণমূল থেকে রাষ্ট্রনায়ক: তারেক রহমানের সংগ্রাম, সংকল্প ও আগামীর বাংলাদেশ

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে তারেক রহমান এমন এক নাম, যাকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে তিন দশকের চড়াই-উতরাই। একাধারে তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এর সন্তান, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার উত্তরসূরি এবং সমসাময়িক রাজনীতির অন্যতম প্রধান কুশীলব। দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের এক নতুন মহাকাব্যিক অধ্যায় সূচিত হয়েছে।

উত্তরাধিকার ও শৈশবের কণ্টকাকীর্ণ পথ

তারেক রহমানের জন্ম ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর, যখন বাংলাদেশ ছিল পূর্ব পাকিস্তান। তাঁর শৈশব ছিল অন্য দশটি সাধারণ শিশুর মতো হলেও পারিপার্শ্বিকতা ছিল রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত উত্তাল। ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মাত্র ৬ বছর বয়সে মা বেগম খালেদা জিয়া ও ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোর সাথে তাঁকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বন্দিশালায় কাটাতে হয়। যুদ্ধের বিভীষিকা এবং পিতার স্বাধীনতার ঘোষণা—এই দুটি চিত্র তাঁর অবচেতন মনে দেশপ্রেমের বীজ বুনে দিয়েছিল।

১৯৮১ সালে যখন তাঁর পিতা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শাহাদাত বরণ করেন, তখন তারেক রহমান কিশোর। পিতার মৃত্যুর পর শোকাভিভূত পরিবারের হাল ধরতে মা বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আসা এবং দীর্ঘ আপসহীন সংগ্রামের প্রতিটি মুহূর্ত তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন। এটিই ছিল তাঁর রাজনীতির প্রথম ও প্রধান পাঠশালা।

তৃণমূল রাজনীতি: ড্রয়িংরুম থেকে গ্রামের মেঠো পথে

তারেক রহমানের রাজনৈতিক উত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। ১৯৮৮ সালে বগুড়ার গাবতলী থানা কমিটির সাধারণ সদস্য পদ গ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি তৃণমূল থেকে রাজনীতি শুরু করেন। তবে তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে ২০০১ সালের পর।

তৃণমূল প্রতিনিধি সম্মেলন: ২০০২ সালে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি সারা দেশে এক অভূতপূর্ব কর্মসূচি শুরু করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাজধানী বা ড্রয়িংরুমে বসে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। তিনি ৬৪টি জেলাকে ২০টি সেক্টরে ভাগ করে গ্রামগঞ্জে সফর শুরু করেন। তাঁর এই সম্মেলনে কেবল বড় বড় নেতারা নয়, বরং প্রান্তিক পর্যায়ের ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের কর্মীরাও কথা বলার সুযোগ পেতেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এই তৃণমূল সংযোগই তারেক রহমানকে সাধারণ মানুষের পালস বোঝার সক্ষমতা দিয়েছে। তিনি কৃষকদের জন্য সার ও বীজের সহজলভ্যতা, পল্লী বিদ্যুতায়ন এবং খালের মানচিত্র তৈরি করে পানি নিষ্কাশনের মতো বাস্তবধর্মী সমস্যা নিয়ে কাজ শুরু করেন।

নির্যাতনের কালবেলা ও ওয়ান-ইলেভেনের প্রেক্ষাপট

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর তারেক রহমান ছিলেন প্রধান লক্ষ্যবস্তু। তাঁকে গ্রেপ্তার করে অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। কারাগারে থাকাকালীন তাঁর মেরুদণ্ড গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তৎকালীন 'মাইনাস টু ফর্মুলা' সফল করতে তারেক রহমানকে রাজনৈতিকভাবে নিস্ক্রিয় করাই ছিল প্রধান উদ্দেশ্য।

২০০৮ সালে উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনি প্যারোলে মুক্তি পেয়ে লন্ডন গমন করেন। শুরু হয় তাঁর ১৭ বছরের দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন।

প্রবাস থেকে নেতৃত্ব: ডিজিটাল বিপ্লবের কারিগর

লন্ডনে থেকেও তারেক রহমান বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে এক মুহূর্তের জন্যও বিচ্ছিন্ন হননি। বিশেষ করে ২০১৮ সালে মা খালেদা জিয়া কারারুদ্ধ হওয়ার পর দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করেন।

জুম মিটিং ও ভার্চুয়াল সভা: বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের নেতাকর্মীদের সাথে প্রতিদিন ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যোগাযোগ রেখে দলটিকে ভেঙে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করেন।

সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইন: ফেসবুক ও ইউটিউবের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে দলের বার্তা পৌঁছে দেওয়া এবং আওয়ামী লীগ সরকারের অনিয়ম তুলে ধরার ক্ষেত্রে তিনি সফল হন।

২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান ও তারেক রহমানের ভূমিকা

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পেছনে তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বের বড় ভূমিকা ছিল। ছাত্র আন্দোলনের শুরু থেকেই তিনি বিএনপির নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন "ছাত্রদের পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়াতে"। ৪ আগস্টের ভাষণে তিনি সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার এবং জনগণের ওপর গুলি না চালানোর যে আহ্বান জানিয়েছিলেন, তা বিপ্লবের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।

'আই হ্যাভ এ প্ল্যান': রাষ্ট্র পুনর্গঠনের দর্শন

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দেশে ফেরার পর তারেক রহমান তাঁর বিখ্যাত "আই হ্যাভ এ প্ল্যান" বা "উই হ্যাভ আ প্ল্যান" ঘোষণা করেন। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশের নীল নকশা। এর প্রধান স্তম্ভগুলো হলো:

দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ: ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের প্রস্তাব।

নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার: জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে সাংবিধানিক স্থায়ী সমাধান।

শুণ্য সহনশীলতা (Zero Tolerance) দুর্নীতিতে: বিগত দেড় দশকের অর্থ পাচার ও দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রকাশ এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা।

তরুণদের ক্ষমতায়ন: ফ্রিল্যান্সিং, তথ্যপ্রযুক্তি এবং কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি।

ধর্মীয় ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিরাপত্তা: "ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার"—এই নীতিতে বিশ্বাসী হয়ে বৈষম্যহীন সমাজ গঠন।

বিশ্লেষণী দৃষ্টিতে তারেক রহমান

রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ মনে করেন, ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির ভূমিধস বিজয় (২০৯টি আসন লাভ) প্রমাণ করে যে সাধারণ মানুষ তারেক রহমানের পরিবর্তনের ডাকে সাড়া দিয়েছে। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন 'জাতীয়তাবাদী শক্তির ঐক্য' এবং 'প্রতিহিংসামুক্ত রাজনীতির' দিকে এগোচ্ছে। তিনি বারবার বলছেন, "আমি ক্ষমতা নয়, জনগণের সেবা করতে চাই।"

চ্যালেঞ্জ ও আগামীর পথ

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর তারেক রহমানের সামনে এখন পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ। ভঙ্গুর অর্থনীতি সংস্কার, বিচারবিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে মর্যাদাপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা তাঁর প্রধান কাজ।

তবে তাঁর মিতব্যয়ী জীবনযাপন এবং পরিমিত কথাবার্তা (মিতভাষী গুণ) সাধারণ জনগণের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে। তিনি কেবল একজন রাজনীতিবিদ নন, বরং ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা জিয়াউর রহমানের আদর্শের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

তারেক রহমানের জীবনপ্রবাহ বাংলাদেশের রাজনীতির একটি জীবন্ত দলিল। যে নেতাকে একদিন নির্যাতনের শিকার হয়ে স্ট্রেচারে করে দেশ ছাড়তে হয়েছিল, আজ তিনি জনগণের বিশাল ম্যান্ডেট নিয়ে দেশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। "আই হ্যাভ এ প্ল্যান" এখন আর কেবল তাঁর একার পরিকল্পনা নয়, এটি এখন কোটি কোটি বাংলাদেশির স্বপ্ন।