যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটিক দলে আসন্ন ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ভেতরকার অসন্তোষ আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। প্রভাবশালী কয়েকজন উদারপন্থী সিনেটর সিনেটের সংখ্যালঘু নেতা চাক শুমারের কৌশল ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে নিজেদের একটি পৃথক জোট গড়ে তুলেছেন। এই জোটের নাম তারা দিয়েছেন ‘ফাইট ক্লাব’।
দলের ভেতরে প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্বের প্রতি ক্ষোভ, প্রার্থী বাছাইয়ে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রভাব এবং ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান না নেওয়ার অভিযোগ—সব মিলিয়ে ‘ফাইট ক্লাব’-এর সিনেটররা মনে করছেন, ডেমোক্র্যাটিক পার্টি পুরোনো কৌশল আঁকড়ে ধরে এগোতে চাইছে। এতে দলীয় তৃণমূলের শক্তি ক্ষয় হচ্ছে এবং নতুন প্রজন্মের প্রার্থী উঠে আসার পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
জোটের আলোচনায় সরাসরি যুক্ত আছেন কমপক্ষে ছয়জন প্রভাবশালী সিনেটর—মেরিল্যান্ডের ক্রিস ভ্যান হোলেন, মিনেসোটার টিনা স্মিথ, কানেকটিকাটের ক্রিস্টোফার মারফি, ভারমন্টের বার্নি স্যান্ডার্স, ম্যাসাচুসেটসের এলিজাবেথ ওয়ারেনসহ আরও অনেকে। তাদের অভিযোগ, শুমার ও সেনেট ডেমোক্র্যাটিক ক্যাম্পেইন কমিটির নেতৃত্ব কিছু নির্বাচনী এলাকায় আগেভাগেই দলীয় প্রার্থী ঠিক করে দিচ্ছে, যা কোনোভাবেই নিরপেক্ষ প্রক্রিয়া নয়।
তারা বিশেষ করে মিনেসোটা, মিশিগান ও মেইনের সেনেট আসনের প্রাথমিক নির্বাচনগুলোতে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অঘোষিত সমর্থন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের দাবি, ভোটারদের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ না দিলে দলের শক্তি বাড়বে না।
গত মাসে শুমার ও সিনেটর কিরস্টেন গিলিব্র্যান্ডের সঙ্গে এক বৈঠকে এই অসন্তোষ বিস্ফোরিত হয়। সেখানে ‘ফাইট ক্লাব’-এর সদস্যরা অভিযোগ করেন, দলের নির্বাচনী কমিটি নীরবে কিছু প্রার্থীকে সুবিধা দিচ্ছে এবং তহবিল সংগ্রহে প্রভাব খাটাচ্ছে। নিউইয়র্কের এই দুই সিনেটর অভিযোগ উড়িয়ে দিলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
এমনকি শুমার নিউইয়র্ক সিটির মেয়র পদে জোহরান মামদানীকে সমর্থন না দেওয়ায় দলের ভেতর হতাশা বাড়ে। শেষ পর্যন্ত মামদানী দলের মনোনয়ন ছাড়াই নির্বাচনে জয়ী হন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, বর্তমান ডেমোক্র্যাটিক নেতৃত্বের ওপর দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অসন্তোষই এবার প্রকাশ্যে বিস্ফোরিত হয়েছে। কয়েক দশকের মধ্যে এমন সংগঠিত অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ আর দেখা যায়নি বলেও তারা মনে করেন।
‘ফাইট ক্লাব’ সদস্যরা ইতোমধ্যে যৌথ প্রচারণা ভিডিও প্রকাশ করেছেন, যেখানে মিনেসোটার লেফটেন্যান্ট গভর্নর পেগি ফ্লানাগানকে সমর্থন জানানো হয়। দলীয় কমিটি যাকে সমর্থনের ইঙ্গিত দিচ্ছে—প্রতিনিধি অ্যাঞ্জি ক্রেইগ—তার বিপরীতে এই সমর্থনকে নেতৃত্ববিরোধী অবস্থান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যদিও এই জোট বর্তমান ডেমোক্র্যাটিক সিনেটরদের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাবে না বলে জানিয়েছে, তবে তারা অপেক্ষাকৃত কম জড়িত নির্বাচনী ক্ষেত্রগুলোতে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে চায়। টেক্সাস ও আইওয়ার প্রাথমিক নির্বাচনেও তাদের নজর থাকবে।
অনেক নির্বাচনী কৌশলবিদ প্রশ্ন তুলছেন—এই সিনেটরদের বেশির ভাগই নিরাপদ ডেমোক্র্যাট–নিয়ন্ত্রিত স্টেট থেকে নির্বাচিত। কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে বাস্তব অভিজ্ঞতা না থাকায় তারা হয়তো জাতীয় পর্যায়ের কৌশল যথেষ্ট বুঝতে পারেন না।
তবুও ‘ফাইট ক্লাব’-এর সদস্যদের বিশ্বাস, প্রাথমিক নির্বাচনে কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপ কমালে দলীয় গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে, জনভিত্তি প্রসারিত হবে, এবং ২০২৬ সালের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা আরও ভালো ফল পাবে।
বার্নি স্যান্ডার্সের ভাষায়, দলের মানসিকতা ও কৌশল বদলানো এখনই জরুরি—নইলে ট্রাম্প যুগের রাজনৈতিক বাস্তবতায় পুরোনো কৌশল নিয়ে টিকে থাকা অসম্ভব।
এই নতুন জোটের প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয় অক্টোবর মাসে, সিনেটর স্যান্ডার্সের অফিসে। এরপর ভ্যান হোলেনের অফিসে আরেকটি বৈঠকে তারা আরো সংগঠিত হওয়ার পরিকল্পনা করেন। তারা যৌথ তহবিল সংগ্রহ, প্রচারণা সমর্থন ও মাঠপর্যায়ে সক্রিয় হওয়ার বিষয়েও আলোচনা করছেন।
ডেমোক্র্যাটিক নেতৃত্বের সঙ্গে এই টানাপোড়েন আগামী মাসগুলোতে আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দলীয় শীর্ষ নেতৃত্ব পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম হবে, নাকি ‘ফাইট ক্লাব’-এর চ্যালেঞ্জ ডেমোক্র্যাটিক রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে—সেটাই এখনো অনিশ্চিত।