হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিস, সোনালি পর্দার সামনে দুই প্রজন্ম ও দুই দর্শনের মুখোমুখি বসা, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আর নিউইয়র্কের নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানি। একদিকে জাতীয়তাবাদী, রিপাবলিকান, “ল অ্যান্ড অর্ডার” রাজনীতির প্রবল কণ্ঠ, অন্যদিকে অভিবাসী, শ্রমজীবী, ভাড়াটে নির্ভর শহরের প্রগ্রেসিভ প্রতিনিধি। এই সাক্ষাৎ শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত ভাষা ছিল বিদ্বেষের, হুমকির, ব্যঙ্গের, সন্দেহের। কিন্তু শেষ দৃশ্যে দেখা গেল এক অদ্ভুত উল্টে যাওয়া প্রেক্ষাপট, যেখানে একই প্রেসিডেন্ট বলছেন, “হি’স অ্যা ভেরি র্যাশনাল পার্সন… দ্য বেটার হি ডাজ, দ্য হ্যাপিয়ার আই অ্যাম।”
মনে রাখতে হবে, খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, যখন এই মামদানিকেই ট্রাম্প বারবার “কমিউনিস্ট লুনাটিক” বলে আখ্যা দিচ্ছিলেন, ইঙ্গিত করছিলেন—সে যদি মেয়র হয়, নিউইয়র্ক সিটির ফেডারেল ফান্ডিং কাটতে তিনি দ্বিধা করবেন না। অপরদিকে মামদানি নির্বাচনী মঞ্চ থেকে ট্রাম্পকে বলেছিলেন “ডেসপট” আর তাঁর এজেন্ডাকে “ফ্যাসিস্ট প্রকল্প”; প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন নিউইয়র্ককে “ট্রাম্প–প্রুফ” শহরে রূপান্তর করবেন। সেইসব বিষাক্ত বাক্যযুদ্ধের পর যখন তাদের প্রথম সাক্ষাৎ হলো, অনেকেই ভেবেছিলেন, ওভাল অফিসে হয়তো হবে কড়া মুখভঙ্গি, বরফশীতল হাত মেলানো, ঠান্ডা ছোট ছোট বাক্য; কিন্তু বাস্তবে ঘটল ঠিক তার উল্টো। এক ধরনের নাটকীয় নরমতা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা আর স্বার্থ-হিসেবের মিশ্র এক দৃশ্য।
ওভাল অফিসে মিডিয়ার সামনে ছোট্ট দশ মিনিটের যে অংশটি প্রকাশ্যে এসেছে, সেখানে দেখা গেল, ফক্স নিউজের রিপোর্টার যখন মামদানিকে জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কি এখনও প্রেসিডেন্টকে “ফ্যাসিস্ট” মনে করেন কি না, মামদানি জবাব ঘুরিয়ে বলতে শুরু করতেই ট্রাম্প হাসতে হাসতে পাশ থেকে বলে উঠলেন, “ইট’স ওকে, ইউ ক্যান জাস্ট সে ইয়েস, আই ডোন’ট মাইন্ড।” উত্তেজনার জায়গায় সেখানে তৈরি হলো এক অদ্ভুত রসিকতার আবহ, যেন দু’জনই বিশ্বমঞ্চকে জানিয়ে দিতে চাইছেন: ব্যক্তিগত অপছন্দ, অতীতের অপবাদ, নির্বাচনী ভাষা সত্ত্বেও তারা কাজের জায়গায় ন্যূনতম এক ধরনের সহাবস্থানে যেতে রাজি।
সাক্ষাতের মূল আলোচ্য ছিল তিনটি শব্দে সংক্ষিপ্ত করা যায়, অ্যাফোর্ডেবিলিটি, হাউজিং, পাবলিক সেফটি। নিউইয়র্কের কস্ট অফ লিভিং ক্রাইসিস নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মামদানি বললেন, শহরটিকে ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন সেই সব পরিবার, যারা এই শহরকে গড়ে তুলেছে। ভাড়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য, ইউটিলিটি বিল, গ্রোসারি সব মিলিয়ে “বেঁচে থাকার দাম” অসহ্য হয়ে উঠেছে। প্রেসিডেন্টও তাঁর নিজস্ব ভঙ্গিতে সুর মিলিয়ে বললেন, ফুয়েল প্রাইস কমে এসেছে, কিন্তু কন এডিসনের বিল তো তেমন কমছে না। সরাসরি ইঙ্গিত করলেন নিউইয়র্কের বিদ্যুৎ সরবরাহকারী কোম্পানিকে রেট কমাতে চাপ দেওয়া হবে। মেয়র ইলেক্ট এককথায় সমর্থন করলেন, বললেন “অ্যাবসোলিউটলি।”
এই ‘অ্যাবসোলিউটলি’র ভেতরেই লুকিয়ে আছে সাক্ষাতের প্রথম বাস্তব ফল। প্রেসিডেন্ট আর মেয়র ইলেক্ট একসাথে নিউইয়র্কের কন এডিসন রেট কমানোর দাবিতে গ্রীন সিগন্যাল দিলেন। এটা সরাসরি কোনও নির্বাহী সিদ্ধান্ত না হলেও, রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটা বড় ইঙ্গিত। কারণ হোয়াইট হাউস আর সিটি হল, দু’দিক থেকে চাপ আসা মানে ইউটিলিটি কোম্পানির ওপর জনগণ সমর্থিত বড় ধরনের নৈতিক, রাজনৈতিক প্রেসার তৈরি হওয়া।
দ্বিতীয় ফলটি এসেছে ভাষা ও ইমেজের স্তরে। ট্রাম্প, যিনি কিছুদিন আগেও বলছিলেন “ওরা নিউইয়র্ককে শেষ করে দেবে”, সেই তিনিই এখন সবার সামনে দাঁড়িয়ে বলছেন, “দ্য বেটার হি ডাজ, দ্য হ্যাপিয়ার আই অ্যাম… আই এক্সপেক্ট টু বি হেল্পিং হিম, নট হার্টিং হিম।” তাঁর মুখে শোনা গেল, “হি হ্যাজ অ্যা চান্স টু ডু সামথিং গ্রেট ফর নিউ ইয়র্ক, অ্যান্ড উই’আর গোয়িং টু হেল্প হিম।” একইসঙ্গে, ইসলামোফোবিক প্রচারণার মাঝখানে দাঁড়িয়ে একজন মুসলিম, অভিবাসী পটভূমির মেয়র ইলেক্টকে নিয়ে যখন এক সাংবাদিক জিজ্ঞেস করলেন,“আপনার পাশে কি একজন জিহাদিস্ট দাঁড়িয়ে আছেন?” ট্রাম্প সরাসরি জবাব দিলেন, “নো, আই ডোন’ট। আই মেট উইথ আ ম্যান হু’জ অ্যা ভেরি র্যাশনাল পার্সন।”
অর্থাৎ, নির্বাচনী সময়ের “কমিউনিস্ট, জু-হেটার, চরমপন্থী” নামধারী মামদানি এক ঝটকায় প্রেসিডেন্টের মুখে হয়ে উঠলেন “র্যাশনাল পার্সন” এটা শুধু শব্দের খেলা নয়, এটা মূলধারার ডানপন্থী রাজনীতির ভেতর এক ধরনের প্রয়োজনীয় বাস্তববাদ প্রবেশের ইঙ্গিতও বটে। কারণ নিউইয়র্ককে ট্রাম্প যতই ঘৃণা করে কথা বলুন, শহরটিকে বাঁচানো না গেলে আমেরিকার অর্থনীতির শিরায় উপশিরায় তার অভিঘাত পড়বে, এই সত্যটা তিনি নিজেও জানেন।
আর মামদানি? তিনি সেখানে দাঁড়িয়ে যতটা সম্ভব সতর্ক, ভারসাম্যপূর্ণ ভূমিকা নিলেন। পুরোনো যুক্তি ট্রাম্প ফ্যাসিস্ট, ডেসপট, তাঁর এজেন্ডা অমানবিক এসব তিনি প্রকাশ্যে প্রত্যাহার করলেন না, আবার ওভাল অফিসে বসে প্রেসিডেন্টের সামনে সেই ভাষা পুনরাবৃত্তিও করলেন না। বরং তিনি বললেন, তিনি কাজ করতে চান “যেখানে আমাদের মিল আছে”, এবং সেই মিলের কেন্দ্রবিন্দু হলো নিউইয়র্কের আট দেড় মিলিয়ন মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট, বাসস্থানের অস্থিতি, আর নিরাপত্তা সংকটের বাস্তবতা।
এই জায়গাতেই সাক্ষাতের তৃতীয় ফলাফল চোখে পড়ার মতো। দু’জনই ক্যামেরার সামনে বারবার “কমন গ্রাউন্ড” শব্দটিকে সামনে আনলেন। প্রেসিডেন্ট বললেন, “উই অ্যাগ্রি অন অ্যা লট মোর দ্যান আই উড হ্যাভ থট,” আর মামদানি বললেন, “আমাদের মতাদর্শগত ভিন্নতা আছে, কিন্তু যেখানে একমত হওয়া যায়, সেখানে আমরা নিউইয়র্কবাসীর জন্য ডেলিভার করতে চাই।” রাজনৈতিক ভাষার ভেতরে এই “ডেলিভার” শব্দটি কিন্তু নিছক ফাঁকা প্রতিশ্রুতি নয়। এটা তাঁর পুরো ক্যাম্পেইনের কেন্দ্রীয় ন্যারেটিভ, যা ঘুরে ঘুরে এসেছে বাস ভাড়া, বাড়ি ভাড়া, গ্রোসারি বিল আর চাকরির মজুরির প্রশ্নে।
তবে মধুর ছবি আর হাসি মশকরায় ভরা পাঁচ/দশ মিনিটের মিডিয়া স্প্রের পেছনে যে কঠিন বাস্তবতা আছে, সেটিও ভুলে গেলে চলবে না। ইমিগ্রেশন ইস্যুতে, ফেডারেল আইস অভিযান নিয়ে, “স্যাংচুয়ারি সিটি” নীতিতে দু’জনের অবস্থান আজও মৌলিকভাবে ভিন্ন। প্রেসিডেন্ট স্পষ্ট করে বলেছেন, “নোন মার্ডারার, নোন ড্রাগ ডিলার” ধরনের লোকদের শহর থেকে বের করে দিতে হবে। মামদানি তাতে উত্তর দিয়েছেন- নিউইয়র্ককে নিরাপদ রাখা, কিন্তু একইসঙ্গে অভিবাসীদের জন্য ন্যায় সংগত নীতি গড়ে তোলা।এই দুইয়ের সমন্বয়ই তাঁর লক্ষ্য। এই দড়ি টানাটানি ভবিষ্যতে আরও তীব্র রূপ নিতে পারে। ওভাল অফিসের হাসি আড্ডা সেই দ্বন্দ্বকে স্থায়ীভাবে মিটিয়ে দেয়নি, বরং সাময়িকভাবে নরম চাদরে ঢেকে রেখেছে মাত্র।
তারপরও বলা যায়, এই সাক্ষাৎটি এক ধরনের “টোনাল ইউ টার্ন” এনেছে। নির্বাচনী ভাষার ঝলমলে ঘৃণা থেকে সরে এসে ট্রাম্প বলছেন, তিনি নিউইয়র্কের নতুন মেয়রকে “হেল্পিং, নট হার্টিং” পজিশনে দেখতে চান। আবার মামদানি বলছেন, তিনি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে অংশীদারিত্বে, অন্তত অ্যাফোর্ডেবিলিটি এজেন্ডায়, দ্রুত কাজ শুরু করতে আগ্রহী। এতে সবচেয়ে সরাসরি সুফল পেতে পারেন নিউইয়র্কের সাধারণ মানুষ। যদি সত্যিই কন এডিসনের রেট কমে, হাউজিং সাবসিডি ও ইনফ্রা ইনভেস্টমেন্টে নতুন বরাদ্দ আসে, স্কুল আর পাবলিক ট্রানজিট ব্যবস্থায় মিলিত বিনিয়োগ বাড়ে।
কিন্তু একইসঙ্গে সতর্কতার আরেকটি স্তরও এখানে আছে। প্রেসিডেন্টের প্রশংসা, ফেডারেল সহায়তার প্রতিশ্রুতি, অর্থনৈতিক সহযোগিতার ইঙ্গিত সবই শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে রাজনৈতিক বাতাস কোনদিকে বইছে, রিপাবলিকান-ডেমোক্র্যাট সংঘাত কতটা তীব্র হয় এবং হোয়াইট হাউস তার জাতীয় এজেন্ডায় নিউইয়র্ককে কতটা অগ্রাধিকার দেয়। আজকের হাসি মাখা তোলা ছবিগুলো তাই ইতিহাসের পাতা নয়, বরং “সম্ভাবনার ঝুলিতে রাখা কিছু ফটোগ্রাফ”। যেগুলোর প্রকৃত অর্থ বের হবে পরের বাজেট, পরের আইন, পরের এক্সিকিউটিভ ডিসিশনে।
সুতরাং, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মেয়র ইলেক্ট জোহরান মামদানির এই সাক্ষাৎকে আমরা বলতে পারি বিদ্বেষের ভাষা থেকে বাস্তবতার দিকে এক ছোট্ট পা ফেলা, যেখানে কোটি মানুষের ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল আর সাবওয়ে যাত্রার প্রতিদিনের হিসাবকে রাজনীতির কেন্দ্রে আনা হয়েছে। ফলাফল আপাতত তিনটি: কন এডিসনের ওপর যৌথ চাপ, নিউইয়র্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে সহযোগিতার প্রকাশ্য প্রতিশ্রুতি, আর একজন মুসলিম, অভিবাসী পটভূমির তরুণ নেতাকে নিয়ে প্রেসিডেন্টের ভাষার নাটকীয় কোমলতা। বাকিটা নির্ভর করবে, এই প্রতিশ্রুতি কতটা বাজেটে রূপ নেয় আর নিউইয়র্কের রাতের বাতাসে হাঁটা মানুষটি কবে অনুভব করবে, এই শহরে বেঁচে থাকা একটু হলেও সহজ হয়েছে।