এখন সময় ডেস্ক • প্রকাশিত: ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ০৯:০১ পিএম • অনলাইন সংস্করণ

ট্রাম্প আতঙ্কে চীনের পথে কানাডা

ট্রাম্প আতঙ্কে চীনের পথে কানাডা

ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণ এবং উত্তর আমেরিকার বাণিজ্য সম্পর্কে অস্থিরতার মেঘ জমতে শুরু করতেই এক নাটকীয় মোড় নিলো বৈশ্বিক রাজনীতি। দীর্ঘ এক দশকের শীতল সম্পর্ক কাটিয়ে চীনের সঙ্গে নতুন করে সখ্যতা গড়ছে কানাডা। ট্রাম্পের ‘শুল্ক-যুদ্ধ’ থেকে বাঁচতে এবং নিজেদের অর্থনীতিকে রক্ষা করতে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বেইজিং সফরে গিয়ে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক সম্পর্কের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন।

শুল্ক যুদ্ধের পাল্টা চাল

ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডার ওপর ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ঢালাও শুল্ক আরোপের হুমকি দেওয়ার পর থেকেই অটোয়া বিকল্প বাজারের খোঁজে ছিল। তারই প্রতিফলন দেখা গেল বেইজিং সফরে। এই সফরে কানাডা তাদের অন্যতম বড় কৃষি পণ্য কানোলা (Canola) রপ্তানির ক্ষেত্রে বিশাল সুবিধা আদায় করে নিয়েছে। চীনের বাজারে কানোলা বীজের ওপর থাকা ৮৪ শতাংশ শুল্ক কমিয়ে মাত্র ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে, যা কানাডার কৃষকদের জন্য এক বিশাল স্বস্তি।

বিনিময়ে, এতদিন চীনের বৈদ্যুতিক যানবাহনের (EV) ওপর কানাডা যে ১০০ শতাংশ শুল্ক বসিয়েছিল, তা কমিয়ে ৬.১ শতাংশ করা হয়েছে। এই পদক্ষেপকে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতির বিপরীতে কানাডার এক সাহসী অবস্থান হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

‘অনির্ভরযোগ্য’ যুক্তরাষ্ট্র ও ভূ-রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা

এক সময় চীনকে ‘কানাডার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি’ হিসেবে আখ্যা দিলেও প্রধানমন্ত্রী কার্নির সুর এখন নরম। তিনি সরাসরি স্বীকার করেছেন যে, ট্রাম্পের অনিশ্চিত নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্র এখন আর আগের মতো ‘নির্ভরযোগ্য বাণিজ্যিক অংশীদার’ নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্প যেভাবে কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘৫১তম অঙ্গরাজ্য’ বা ‘নতুন রাজ্য’ হিসেবে গড়ে তোলার পরোক্ষ হুমকি দিয়েছিলেন, তা কানাডীয়দের মধ্যে আত্মমর্যাদার সংকটে ফেলেছে। ফলে তারা এখন বাধ্য হয়েই চীনের মতো বিশাল বাজারের দিকে ঝুঁকছে।

পুরানো তিক্ততা ভুলে নতুন পথচলা

২০১৮ সালে হুয়াওয়ে কর্মকর্তা মেং ওয়ানজু এবং দুই কানাডীয় নাগরিক ‘টু মাইকেলস’কে নিয়ে যে কূটনৈতিক লড়াই শুরু হয়েছিল, তা ছিল এই দুই দেশের সম্পর্কের ইতিহাসে সবচেয়ে কালো অধ্যায়। তবে বর্তমান সফর সেই বরফ অনেকটাই গলিয়ে দিয়েছে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী জঁ শেরে (Jean Charest) এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, "যুক্তরাষ্ট্র আমাদের পরম মিত্র ঠিকই, কিন্তু এক ঝুড়িতে সব ডিম রাখা এখন বিপজ্জনক। কানাডাকে তার বাণিজ্যের বহুমুখীকরণ করতেই হবে।"

ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও শঙ্কা

তবে এই নতুন সখ্যতা খুব একটা মসৃণ হবে না। কানাডার অভ্যন্তরে এখনো চীনের গোয়েন্দা তৎপরতা এবং নির্বাচনী হস্তক্ষেপ নিয়ে গভীর উদ্বেগ রয়েছে। হংকংয়ের মানবাধিকার ইস্যু এবং জিনজিয়াং পরিস্থিতি নিয়েও কানাডীয় জনগণের বড় একটি অংশের মধ্যে ক্ষোভ আছে। তাছাড়া, বেইজিংয়ের এই ঘনিষ্ঠতাকে ট্রাম্প প্রশাসন কীভাবে নেবে, তা নিয়েও অটোয়ার নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি কাজ করছে।

কানাডার এই পদক্ষেপ স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের রক্ষণশীল বাণিজ্য নীতি বিশ্বজুড়ে নতুন নতুন জোট তৈরিতে বাধ্য করছে। যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দিয়ে চীন-কানাডার এই ‘ব্যবহারিক বন্ধুত্ব’ (Pragmatic Friendship) বৈশ্বিক অর্থনীতির মোড় বদলে দিতে পারে।