এখন সময় ডেস্ক • প্রকাশিত: ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১০:৪৮ পিএম • অনলাইন সংস্করণ

ট্রাম্পের ‘নাগরিকত্ব ছিনিয়ে নেওয়া’র মিশন নিয়ে বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক

ট্রাম্পের ‘নাগরিকত্ব ছিনিয়ে নেওয়া’র মিশন নিয়ে বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক

যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক ইতিহাস ও অভিবাসীবান্ধব ভাবমূর্তির ওপর নেমে এসেছে এক অভূতপূর্ব কালো ছায়া। ট্রাম্প প্রশাসন শুরু করেছে এক বিতর্কিত 'ডিন্যাচারালাইজেশন' বা নাগরিকত্ব বাতিলের অভিযান। এই প্রকল্পের মাধ্যমে হাজার হাজার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় নাগরিক হওয়া (Naturalized) আমেরিকানের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। যা একসময় কেবল নাৎসি যুদ্ধাপরাধী বা চরমপন্থী সন্ত্রাসীদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতো, এখন তা সাধারণ অভিবাসী নাগরিকদের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি কেবল আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয়তাবাদী দর্শনের এক প্রতিফলন, যেখানে বার্তা দেওয়া হচ্ছে—যুক্তরাষ্ট্রে কেউই এখন আর নিরাপদ নয়।

ভয়ের সংস্কৃতির বিস্তার: উৎসবের আমেজ এখন আতঙ্কে

একসময় অভিবাসীদের জন্য মার্কিন নাগরিকত্ব গ্রহণ ছিল জীবনের শ্রেষ্ঠতম মুহূর্ত। বর্ণিল আয়োজনে শপথ নেওয়ার মাধ্যমে তারা নিজেদের আমেরিকান সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গড়ে তুলতেন। কিন্তু বর্তমান প্রশাসনের এই ডিন্যাচারালাইজেশন অপারেশন সেই আনন্দের মুহূর্তটিকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। এখন নাগরিকত্ব পাওয়ার উদযাপনের আড়ালে কাজ করছে এক গভীর সংশয় ও ভয়।

যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার রক্ষা সংস্থাগুলো বলছে, এই পদক্ষেপটি অত্যন্ত নিষ্ঠুর এবং পদ্ধতিগত। বহু বছর আগে নাগরিকত্বের আবেদনের সময় করা কোনো ছোটখাটো ভুল বা অসঙ্গতি এখন খুঁড়ে বের করা হচ্ছে। এর ফলে যারা বৈধভাবে কয়েক দশক ধরে আমেরিকায় বসবাস করছেন এবং নাগরিক হিসেবে কর দিচ্ছেন, তারাও আজ অস্তিত্ব সংকটে ভুগছেন। শুধু তাই নয়, যারা গ্রিন কার্ডধারী বা বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা (LPR), তারা এখন নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে ভয় পাচ্ছেন। তাদের মনে সংশয় তৈরি হয়েছে যে, পূর্ণ নাগরিক হওয়ার পরও যদি কোনো অজুহাতে তা কেড়ে নেওয়া হয়, তবে এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার অর্থ কী?

কাদের লক্ষ্য করা হচ্ছে এই অভিযানে?

জানুয়ারি ২০১৭ থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে সমাজের একটি বিশাল অংশকে। আগের প্রশাসনগুলোর আমলে যারা ছদ্মনাম ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে আসা নাৎসি যুদ্ধাপরাধী ছিলেন, মূলত তাদের নাগরিকত্ব বাতিলের চেষ্টা করা হতো। কিন্তু বর্তমান প্রশাসন সেই মানদণ্ডকে আমূল বদলে দিয়েছে।

এখন টার্গেট করা হচ্ছে এমন ব্যক্তিদের যাদের বিরুদ্ধে হয়তো বহু বছর আগের কোনো বহিষ্কারাদেশ (Removal Order) ছিল যা তারা জানতেনও না, অথবা আবেদনের সময় তথ্যের সামান্যতম অমিল ছিল। এমনকি এমন অনেক অপরাধের অভিযোগ আনা হচ্ছে যা নাগরিকত্ব নেওয়ার সময় হয়তো রেকর্ডেই ছিল না বা কোনো চার্জ গঠন করা হয়নি। একজন মার্কিন নাগরিক কোনো অপরাধ করলে তাকে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু এখন জন্মসূত্রে নাগরিক এবং স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় নাগরিক হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে এক বিভাজন তৈরি করা হয়েছে। এই নতুন নীতি যেন বুঝিয়ে দিচ্ছে, নাগরিকত্ব কোনো অলঙ্ঘনীয় অধিকার নয়, বরং সরকারের একটি উপহার যা যেকোনো সময় প্রত্যাহার করা সম্ভব।

আঁতকে ওঠার মতো পরিসংখ্যান

পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে এই অভিযানের ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৯৯০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বছরে গড়ে মাত্র ১১ জনের নাগরিকত্ব বাতিল করা হতো। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন আসার পর থেকে এই চিত্র নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। ডিপার্টমেন্ট অফ হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (DHS) ইতোমধ্যে ৯৫টি মামলা বিচার বিভাগে (DOJ) পাঠিয়েছে। ২০১৮ সালের শুরুতে ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস (USCIS) জানিয়েছিল, তারা আরও প্রায় ১৬০০ নাগরিককে বিচারের আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে।

সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে ২০১৯ সালের বাজেট অনুরোধে। সেখানে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (ICE) প্রকাশ করেছে যে, তারা সাত লক্ষ (৭০০,০০০) মার্কিন নাগরিকের ফাইল পুনরায় পর্যালোচনা করার পরিকল্পনা করছে। এর অর্থ হলো, সাত লক্ষ মানুষের জীবন এখন অনিশ্চয়তার মুখে। প্রশাসনিক স্তরে এই বিপুল কর্মযজ্ঞ প্রমাণ করে যে, এটি কেবল বিক্ষিপ্ত কোনো ঘটনা নয়, বরং সুপরিকল্পিতভাবে একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে টার্গেট করা হচ্ছে।

নাগরিকত্ব বাতিলের জটিল আইনি প্রক্রিয়া

যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী, কারো নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া খুব সহজ বিষয় নয়। এটি কেবল ফেডারেল আদালতের মাধ্যমেই সম্ভব। সরকারকে প্রমাণ করতে হয় যে, নাগরিকত্ব অর্জনের সময় ওই ব্যক্তি জালিয়াতি করেছেন বা কোনো বড় সত্য গোপন করেছেন। এটি দেওয়ানি (Civil) বা ফৌজদারি (Criminal) উভয় প্রক্রিয়ায় হতে পারে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন যে গতিতে এবং যে ধরনের পুরনো তথ্যের ভিত্তিতে এই মামলাগুলো করছে, তাতে আইনি মানদণ্ড ও ‘ডিউ প্রসেস’ বা ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংবিধান বিশেষজ্ঞরা।

বিশ্লেষণমূলক দৃষ্টিভঙ্গি: গণতন্ত্রের জন্য এক অশুভ সংকেত

নির্বাচন এবং ক্ষমতার পালাবদলের এই সময়ে ট্রাম্প প্রশাসনের এই ড্রাকোনিয়ান বা কঠোর কৌশলগুলো যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে তারা নির্ধারণ করতে চাচ্ছে—আসল আমেরিকান কারা এবং কারা নয়। এটি কেবল আইনি সংস্কার নয়, বরং এটি একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার যা অভিবাসী সমাজকে আতঙ্কিত করে রাখতে ব্যবহৃত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নাগরিকত্বের এই অবমূল্যায়ন আমেরিকান সমাজের স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করবে। যদি কয়েক দশক ধরে নাগরিক হিসেবে বসবাস করার পরও কোনো ব্যক্তি তার অবস্থান নিয়ে নিশ্চিত হতে না পারেন, তবে সামাজিক সংহতি ভেঙে পড়বে। আন্তর্জাতিক মহলেও এই পদক্ষেপ নিয়ে তীব্র সমালোচনা হচ্ছে। যেখানে আমেরিকা নিজেকে স্বাধীনতার আলোকবর্তিকা হিসেবে দাবি করে, সেখানে নিজ নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করা এক নেতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করছে।

পরিশেষে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো বৃহৎ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যেমন ক্ষমতার নতুন সমীকরণ তৈরি হয়, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের এই নীতি পরিবর্তনও দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করছে। ডিন্যাচারালাইজেশনের এই অপারেশন যদি অব্যাহত থাকে, তবে তা কেবল অভিবাসীদের জন্য নয়, বরং আমেরিকান সংবিধানের মূল স্তম্ভগুলোর জন্যই এক দীর্ঘমেয়াদী হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। নাগরিকদের সুরক্ষা ও ন্যায়বিচারের যে আদর্শে আমেরিকা প্রতিষ্ঠিত, তা আজ এক বড় পরীক্ষার সম্মুখীন।