মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যখন ইসরায়েলি এফ-৩৫ ফাইটার জেটের গর্জনের সাথে মার্কিন বি-৫২ বোমারু বিমানের হুঙ্কার শোনা যাচ্ছিল, তখন বিশ্ববাসী কেবল তেহরান আর ইসফাহানের বিস্ফোরণগুলোই দেখছিল। কিন্তু এই প্রলয়ঙ্কারী সামরিক অভিযানের আসল যুদ্ধটি শুরু হয়েছে মার্কিন রাজনীতির অন্দরমহলে। বিশেষ করে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অভ্যন্তরে ইসরায়েল এবং ইরান নীতি নিয়ে যে ফাটল ছিল, তা এখন এক বিশাল গহ্বরে পরিণত হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ইরান ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান কেবল তেহরানের পারমাণবিক স্বপ্নকেই ধুলিসাৎ করেনি, বরং মার্কিন নির্বাচনী রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি করেছে। একদিকে রিপাবলিকানরা এই হামলাকে ‘নিরাপত্তার জয়’ হিসেবে দেখছে, অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটদের মাঝে শুরু হয়েছে আদর্শিক গৃহযুদ্ধ।
এআইপিএসি (AIPAC): পর্দার আড়ালের আসল খেলোয়াড়?
এই যুদ্ধের ডামাডোলে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটির (AIPAC) ভূমিকা। ট্রাম্পের এই আক্রমণাত্মক নীতিকে এআইপিএসি প্রকাশ্য সমর্থন জানানোর পর থেকেই ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিগুলোতে উত্তাপ ছড়িয়েছে। বিশেষ করে যেসব আসনে এআইপিএসি বিশাল অংকের অর্থ বিনিয়োগ করছে, সেখানে প্রগতিশীল বা ‘প্রগ্রেসিভ’ প্রার্থীরা এখন ইসরায়েল বিরোধিতাকে তাদের নির্বাচনী প্রচারণার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
বার্নি স্যান্ডার্সের প্রাক্তন পররাষ্ট্র নীতি উপদেষ্টা ম্যাট ডাস বিষয়টিকে ‘লিটমাস টেস্ট’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তার মতে, "ফিলিস্তিন এবং এখন ইরান—এই দুটি ইস্যু ডেমোক্র্যাটিক পার্টির জন্য টিকে থাকার লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রার্থীরা এখন বাধ্য হচ্ছেন গাজা ইস্যুকে গণহত্যা হিসেবে স্বীকার করতে এবং এআইপিএসি-র ফান্ড নিতে অস্বীকার করতে।"
নির্বাচনী ময়দানে যুদ্ধের উত্তাপ: নর্থ ক্যারোলাইনা থেকে মিশিগান
নর্থ ক্যারোলাইনার হাউস রেস থেকে শুরু করে ইলিনয় এবং মিশিগানের সেনেট প্রাইমারি—প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধের প্রভাব স্পষ্ট।
১. নর্থ ক্যারোলাইনা: প্রতিনিধি ভ্যালেরি ফাউশি, যিনি একসময় এআইপিএসি-র সমর্থন নিয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন, তিনি এখন ভোল পাল্টেছেন। ২০২৫ সালে তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে তিনি আর এই সংস্থার টাকা নেবেন না। তার প্রতিদ্বন্দ্বী নিদা আল্লাম, যিনি নর্থ ক্যারোলাইনার প্রথম মুসলিম নারী প্রতিনিধি, তিনি এই যুদ্ধকে ট্রাম্পের ‘অবৈধ ও বেপরোয়া’ যুদ্ধ বলে অভিহিত করেছেন।
২. ইলিনয়: ইলিনয়ে এআইপিএসি-র ঘনিষ্ঠ সংস্থাগুলো প্রায় ১৪ মিলিয়ন ডলার খরচ করছে। ইভানস্টন মেয়র ড্যানিয়েল বিস সরাসরি ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুকে অভিযুক্ত করেছেন ‘ভুল এবং অবৈধভাবে শাসন ক্ষমতা পরিবর্তনের যুদ্ধ’ চাপিয়ে দেওয়ার জন্য। অন্যদিকে, ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মার্কিন অ্যাক্টিভিস্ট ক্যাট আবুঘাজলেহ এই যুদ্ধকে ‘ফোরএভার ওয়ার’ বা চিরস্থায়ী যুদ্ধের সূচনা বলে সতর্ক করেছেন।
৩. মিশিগান: মিশিগান হচ্ছে মার্কিন ভূ-রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র, যেখানে আরব-আমেরিকান ভোটারদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ২০২৪ সালের নির্বাচনেও এখানে ‘আনকমিটেড’ মুভমেন্ট ডেমোক্র্যাটদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছিল। এখন ইরানের ওপর হামলা সেই ক্ষোভকে আরও উস্কে দিয়েছে। ‘আনকমিটেড’ মুভমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা লায়লা এলাবেদ স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ডেমোক্র্যাট ভোটাররা তাদের ট্যাক্সের টাকা দিয়ে আর কোনো যুদ্ধ দেখতে চায় না।
ভারতের ‘মাস্টারস্ট্রোক’ ও কূটনৈতিক সমীকরণ
এই সামরিক অভিযানের পেছনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাম্প্রতিক ইসরায়েল সফরকে অনেক বিশ্লেষক অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘এপিক ফিউরি’ অভিযানের ঠিক ২৪ ঘণ্টা আগে মোদির ইসরায়েল সফর কেবল দ্বিপাক্ষিক ছিল না। অভিযোগ উঠেছে, চাবাহার বন্দর এবং ওমানের দুকুম বন্দরে ভারতের যে নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, তা ব্যবহার করে ইসরায়েলকে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করা হয়েছে।
তাছাড়া, তালেবান কার্ড ব্যবহার করে পাকিস্তানকে পশ্চিম সীমান্তে ব্যস্ত রাখা ছিল এই অভিযানের অন্যতম কৌশলগত সাফল্য। এর ফলে ইরান তার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিবেশি পাকিস্তানের কাছ থেকে কোনো কার্যকর সামরিক সহায়তা পায়নি।
অস্তিত্বের সংকটে ইরান ও বৈশ্বিক মেরুকরণ
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির সুরক্ষিত বাংকারে ‘বাংকার-বাস্টার’ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত যতটা শক্তিশালী ছিল, তার চেয়েও বড় আঘাত এসেছে কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা থেকে। রাশিয়া এবং চীন এই পরিস্থিতিতে ভারতের নীরব কিন্তু প্রভাবশালী ভূমিকা এবং ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক মেজাজকে কীভাবে মোকাবেলা করবে, তা নিয়ে সারা বিশ্ব উদ্বিগ্ন।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই সামরিক পরাজয় কেবল অস্ত্রের লড়াই নয়, এটি ছিল দীর্ঘমেয়াদী এবং সূক্ষ্ম কূটনৈতিক ‘মাস্টারস্ট্রোক’। তবে এর ফলে দক্ষিণ এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ভারত এখন এক নীরব কিন্তু অত্যন্ত প্রভাবশালী খেলোয়াড় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
যুদ্ধের পর কী?
ইরানের শাসনব্যবস্থা এখন ছিন্নভিন্ন। কিন্তু মার্কিন ডেমোক্র্যাট শিবিরের লড়াই মাত্র শুরু। ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ ডেমোক্র্যাটিক পার্টির বাম ও ডানপন্থী অংশের মধ্যে যে বিভাজন তৈরি করেছে, তা ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও বড় প্রভাব ফেলবে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ব্রায়ান রমিক বলেন, "কেউই ইরানের পক্ষে দাঁড়াতে চায় না, কিন্তু ডেমোক্র্যাটরা এখন জানতে চায়—এই যুদ্ধের শেষ কোথায়? স্ট্র্যাটেজি কী?"
মধ্যপ্রাচ্যের বালুকারাশি এখন ইরানি রক্তে রঞ্জিত, কিন্তু এর রাজনৈতিক উত্তাপ এখন ওয়াশিংটনের ক্যাপিটল হিলের করিডোর থেকে মিশিগানের রাজপথ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এই যুদ্ধ কেবল তেহরান দখল নয়, বরং মার্কিন রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথও নির্ধারণ করে দিচ্ছে।