এখন সময় ডেস্ক • প্রকাশিত: ০২ মার্চ ২০২৬, ০৮:২৯ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

ট্রাম্পের ‘ইউ-টার্ন’ ও মধ্যপ্রাচ্যে এক নতুন ধ্বংসযজ্ঞের নেপথ্য কাহিনী

ট্রাম্পের ‘ইউ-টার্ন’ ও মধ্যপ্রাচ্যে এক নতুন ধ্বংসযজ্ঞের নেপথ্য কাহিনী

২০১৭ সালে রিয়াদ সফরের সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘটা করে ঘোষণা করেছিলেন, মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে এক নতুন যুগের সূচনা হতে যাচ্ছে। তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন, আমেরিকা আর কোনো জাতির ‘ভাগ্যবিধাতা’ হতে চায় না, অন্য কোনো দেশের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের দায়িত্বও নেবে না। পূর্বসূরিদের কড়া সমালোচনা করে তিনি বলেছিলেন, "তথাকথিত জাতি-নির্মাতারা (Nation-builders) দেশ গড়ার চেয়ে ধ্বংসই বেশি করেছে।"

কিন্তু এক দশক পার হওয়ার আগেই সেই ট্রাম্পই এখন ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত এবং ধ্বংসাত্মক এক যুদ্ধের নায়ক। গত শনিবার ভোরে ইরানের ওপর যে ‘অল-আউট’ হামলা শুরু হয়েছে, তার লক্ষ্য হিসেবে ট্রাম্প এখন ব্যবহার করছেন সেই পুরনো ‘নিও-কনজারভেটিভ’ ভাষা—যাকে একসময় তিনি নিজেই ঘৃণা করতেন। জর্জ ডব্লিউ বুশের মতো তিনিও এখন ইরানে ‘স্বাধীনতা’ আমদানির দোহাই দিচ্ছেন।

নীতির আদর্শিক বিচ্যুতি: কার স্বার্থে এই যুদ্ধ?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই যুদ্ধ ট্রাম্পের ঘোষিত ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সাথে একেবারেই যায় না। নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি বারবার বলেছিলেন, আমেরিকা আর কোনো ‘অন্তহীন যুদ্ধে’ (Endless Wars) জড়াবে না। তাহলে হঠাৎ এই ভোলবদল কেন?

ওয়াশিংটন ডিসির ‘সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসি’-র সিনিয়র ফেলো নিগার মোর্তাজাভি আল-জাজিরাকে বলেন, "এটি পুরোপুরি ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া একটি যুদ্ধ। গত দুই দশক ধরে ইসরায়েল আমেরিকাকে ইরানের ওপর হামলার জন্য প্ররোচিত করে আসছিল, শেষ পর্যন্ত তারা সফল হয়েছে। যে প্রেসিডেন্ট নিজেকে ‘শান্তির দূত’ হিসেবে দাবি করতেন, তার এই আক্রমণাত্মক রূপ চরম পরিহাস ছাড়া আর কিছু নয়।"

নেতানিয়াহুর ‘পারমাণবিক’ জুজু ও নতুন অজুহাত

২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পেছনেও বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর বড় ভূমিকা ছিল। গত ২০ বছর ধরে তিনি প্রচার করছেন যে ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরির একদম দ্বারপ্রান্তে। যদিও খোদ ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন যে, তেহরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের কোনো প্রমাণ মেলেনি।

গত বছর জুনে ১২ দিনের সংক্ষিপ্ত যুদ্ধে ইরানের প্রধান পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস করার পর নেতানিয়াহু নতুন এক ‘ভয়’ সামনে নিয়ে আসেন—ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল। তিনি দাবি করেন, ইরানের মিসাইল সরাসরি আমেরিকার পূর্ব উপকূলে আঘাত হানতে সক্ষম। সম্প্রতি স্টেট অফ দ্য ইউনিয়ন ভাষণে ট্রাম্পও একই সুর মেলালেন, যদিও এর পক্ষে কোনো শক্ত প্রমাণ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দিতে পারেনি।

কূটনীতির টেবিলে যখন আগুনের গোলা

সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, এই হামলা এমন এক সময়ে শুরু হয়েছে যখন ওমানি মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার পরিবেশ তৈরি হচ্ছিল। গত বৃহস্পতিবারও দুই দেশের প্রতিনিধিরা পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ইতিবাচক আলোচনার কথা জানিয়েছিলেন।

‘ন্যাশনাল ইরানিয়ান আমেরিকান কাউন্সিল’-এর প্রেসিডেন্ট জামাল আবদি বলেন, "নেতানিয়াহুর মূল লক্ষ্যই ছিল যে কোনো কূটনৈতিক সমাধান ভণ্ডুল করা। তিনি ভয় পাচ্ছিলেন যে ট্রাম্প হয়তো ইরানের সাথে সত্যিই কোনো চুক্তিতে পৌঁছে যাবেন। গত বছরের জুনেও তিনি ঠিক একই কাজ করেছিলেন, আলোচনার মাঝপথেই যুদ্ধ বাঁধিয়েছিলেন।"

জনমতের তোয়াক্কা নেই হোয়াইট হাউসে

আমেরিকার সাধারণ মানুষ এখন যুদ্ধের ঘোর বিরোধী। ইউনিভার্সিটি অফ মেরিল্যান্ডের এক সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ২১ শতাংশ আমেরিকান ইরানের সাথে যুদ্ধের পক্ষে। এমনকি ট্রাম্পের কড়া সমর্থক হিসেবে পরিচিত ডানপন্থী চিন্তাবিদরাও এই যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।

জনপ্রিয় মার্কিন ধারাভাষ্যকার টাকার কার্লসন এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবিকে প্রশ্ন করেন, "ইরান আমাদের জন্য হুমকি কেন?" হাকাবি যখন লেবানন সীমান্তে হিজবুল্লাহর সমস্যার কথা বলেন, তখন কার্লসন পাল্টা উত্তর দেন, "আমি আমেরিকার মেইন (Maine) অঙ্গরাজ্যে থাকি। লেবানন সীমান্তে কী হচ্ছে তাতে একজন আমেরিকানের কী আসে যায়?"

কংগ্রেসওম্যান রাশিদা তালাইব এক বিবৃতিতে বলেছেন, "ট্রাম্প আমেরিকান রাজনৈতিক অভিজাত শ্রেণি এবং ইসরায়েলি বর্ণবাদী সরকারের হিংসাত্মক কল্পনা চরিতার্থ করছেন। তিনি সাধারণ আমেরিকানদের ‘আর কোনো যুদ্ধ নয়’—এই আর্তনাদ উপেক্ষা করছেন।"

যুদ্ধের ফলাফল ও পরবর্তী সম্ভাবনা

এই প্রলয়ঙ্করী যুদ্ধের দ্বিতীয় দিনে খামেনির মৃত্যুর পর পরিস্থিতি যেদিকে মোড় নিতে পারে:

আইআরজিসি-র চরম প্রতিশোধ: ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ডস কর্পস (IRGC) ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে যে, তারা কয়েক মুহূর্তের মধ্যে মার্কিন ঘাঁটি এবং ইসরায়েলি ভূখণ্ড লক্ষ্য করে হামলা চালাবে। এতে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা হাজার হাজার মার্কিন সেনার জীবন ঝুঁকিতে পড়বে।

তেল ও বিশ্ব অর্থনীতি: পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের অধিকাংশ তেলের সরবরাহ হয়। যুদ্ধের ফলে তেলের দাম আকাশচুম্বী হতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধস নামাবে।

ইরানে ক্ষমতার লড়াই: খামেনির মৃত্যুর পর কে হবেন পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা? আলি লারিজানি, হাসান খোমেনি নাকি কোনো কট্টরপন্থী সামরিক জান্তা? এই অভ্যন্তরীণ লড়াই ইরানকে দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

নতুন মেরুকরণ: ইসরায়েল ও সৌদি আরব একদিকে থাকলেও, রাশিয়া ও চীন এই যুদ্ধে ইরানের পাশে দাঁড়াতে পারে। এতে যুদ্ধটি কেবল আঞ্চলিক নয়, বরং তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের রূপ নিতে পারে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প যে ‘এপিক ফিউরি’ বা মহাকাব্যিক ক্রোধের সূচনা করেছেন, তার মূল্য হয়তো দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্বকে দিতে হবে। শান্তি ও ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির বুলি আওড়ানো একজন প্রেসিডেন্টের হাত ধরে মধ্যপ্রাচ্য এখন এক অতল গহ্বরে নিমজ্জিত। ইতিহাস এই যুদ্ধকে ‘প্রয়োজনীয় রক্ষা’ হিসেবে দেখবে নাকি ‘ইসরায়েলের স্বার্থে মার্কিন আত্মহনন’ হিসেবে—তা সময়ই বলে দেবে।