ইরানের রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান ‘অপারেশন লায়ন’স রোর’ বা ‘এপিক ফিউরি’ বিশ্ব রাজনীতিতে তীব্র মেরুকরণ তৈরি করেছে। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই হামলাকে ‘মহৎ মিশন’ হিসেবে বর্ণনা করছেন, অন্যদিকে রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ একে ওয়াশিংটনের ‘প্রতারণা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। খোদ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও এই হামলার সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
রাশিয়ার তোপ: ‘শান্তি আলোচনা ছিল হামলার ঢাল’
রুশ নিরাপত্তা পরিষদের উপপ্রধান ও সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ টেলিগ্রামে এক বিস্ফোরক বার্তায় অভিযোগ করেছেন, ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক পরমাণু আলোচনা ছিল মূলত সামরিক অভিযান আড়াল করার একটি কৌশল। তিনি বলেন, “শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী (যুক্তরাষ্ট্র) আবারও তার আসল চেহারা দেখাল। আলোচনার টেবিল ছিল কেবল হামলার ঢাল; বাস্তবে সমঝোতার কোনো ইচ্ছাই তাদের ছিল না।”
বিশ্লেষকদের মতে, ওমানের মধ্যস্থতায় গত বৃহস্পতিবার জেনেভায় অনুষ্ঠিত বৈঠকটি ছিল একটি ‘কূটনৈতিক ফাঁদ’। রাশিয়া মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দীর্ঘ সময় ধরে এই হামলার পরিকল্পনা করছিল এবং আলোচনাকে কেবল বিশ্ববাসীকে বিভ্রান্ত করার জন্য ব্যবহার করেছে।
খোদ যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের সমালোচনা: ‘অবৈধ ও অসাংবিধানিক’
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই সামরিক পদক্ষেপকে ‘অবৈধ’ বলে অভিহিত করেছেন প্রভাবশালী মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড জে. মার্কি। তিনি বলেন, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া এই হামলা চালিয়ে ট্রাম্প সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন। মার্কি অভিযোগ করেন, ট্রাম্প পরিকল্পিতভাবে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতাকে অতিরঞ্জিত করে দেখাচ্ছেন, যেখানে খোদ পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও স্বীকার করেছেন যে ইরান বর্তমানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছে না।
সিনেটর মার্কি আরও বলেন, “আমেরিকানরা মধ্যপ্রাচ্যে আর কোনো অন্তহীন যুদ্ধ চায় না। যখন দেশের মানুষ স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে, তখন তরুণদের বিদেশের মাটিতে মরতে পাঠানো সমর্থনযোগ্য নয়।”
বিশ্ব নেতাদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া: সংহতি বনাম সতর্কতা
ইরানে হামলার ঘটনায় বিশ্বজুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে:
স্পেন: প্রধানমন্ত্রী সানচেজ এই একতরফা পদক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, এটি বিশ্বকে আরও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়া: প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিস ইরানের জনগণের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং পরমাণু অস্ত্র রোধে যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন জানিয়েছেন।
ইতালি: প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি ইরানের সাধারণ মানুষের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন এবং আঞ্চলিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU): প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন সব পক্ষকে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার এবং বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
সামরিক প্রেক্ষাপট ও ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’
গত বছরের জুনেও পরমাণু আলোচনা চলাকালে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় আঘাত হেনেছিল, যার নাম ছিল ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’। বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের হামলা সেই ধারাবাহিকতারই অংশ। শনিবার সকালে শুরু হওয়া এই হামলায় ইরানের শীর্ষ সামরিক নেতৃত্ব বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছেন, যা ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে একটি ছায়াযুদ্ধকে প্রকাশ্য যুদ্ধে রূপ দিয়েছে।
যুদ্ধের গন্তব্য কোথায়?
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির প্রাসাদ ধ্বংস হওয়া এবং সামরিক গোয়েন্দা দপ্তরে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানা ইঙ্গিত দেয় যে, এবারের অভিযানের লক্ষ্য কেবল পারমাণবিক স্থাপনা নয়, বরং ইরানের ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন’ (Regime Change)। তবে ইরান যেভাবে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে, তাতে এই সংঘাত কেবল তেহরানে সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
রাশিয়া ও চীনের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তার ওপর নির্ভর করছে এই সংঘাত একটি ‘বৈশ্বিক যুদ্ধে’ রূপ নেবে কি না। অন্যদিকে, মার্কিন কংগ্রেস যদি এই হামলার অর্থায়ন বা অনুমোদন দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটেও পড়তে পারেন।