এখন সময় ডেস্ক • প্রকাশিত: ২২ জানুয়ারী ২০২৬, ০৪:১৩ পিএম • অনলাইন সংস্করণ

ট্রাম্পের শুল্ক নীতির ৯৬ শতাংশ বোঝা বইছে মার্কিন নাগরিকরাই

ট্রাম্পের শুল্ক নীতির ৯৬ শতাংশ বোঝা বইছে মার্কিন নাগরিকরাই

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিতর্কিত শুল্ক নীতির প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে এক নতুন অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি জার্মানির কিল ইনস্টিটিউট ফর দ্য ওয়ার্ল্ড ইকোনমি পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, গত বছর ট্রাম্পের আরোপিত শুল্কের ব্যয়ের প্রায় ৯৬ শতাংশই বহন করতে হয়েছে খোদ মার্কিন ক্রেতাদের। প্রায় ২৫ মিলিয়ন লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা জানিয়েছেন, আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো এই ব্যয়ের মাত্র ৪ শতাংশ নিজেরা বহন করেছে, বাকি বিশাল অংশটি পণ্যের দাম বাড়িয়ে সাধারণ ক্রেতাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে মার্কিন শুল্ক রাজস্ব গত বছর প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

গবেষণায় আরও উঠে এসেছে যে, ইউরোপ ও এশিয়ার মতো বিকল্প বাজারের উপস্থিতি এবং রাতারাতি সরবরাহকারী পরিবর্তনের জটিলতার কারণেই আমদানিকারক কোম্পানিগুলো শুল্কের পুরো বোঝাটি ক্রেতাদের দিকে ঠেলে দিয়েছে। গত বছরের এপ্রিলে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের আমদানির ওপর ১০ শতাংশ এবং চীনসহ নির্দিষ্ট কিছু খাতের ওপর উচ্চ হারে শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ভারত ও ব্রাজিলের ওপর এই শুল্কের হার বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করা হয়। যদিও গত নভেম্বরে ব্রাজিল থেকে কফি, ফল ও মাংসের মতো খাদ্যদ্রব্য আমদানির ওপর শুল্ক তুলে নিয়েছিল প্রশাসন।

বর্তমানে নতুন এক কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের শুরু হয়েছে গ্রিনল্যান্ডকে কেন্দ্র করে। দ্বীপটির খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিতে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডকে চাপ দিতে নতুন করে শুল্কের হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের আটটি দেশের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব ইস্যুতে মার্কিন দাবি মেনে না নিলে আগামী জুনে এই শুল্ক ২৫ শতাংশে উন্নীত করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।

এদিকে এই শুল্ক নীতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে মার্কিন মুদ্রাস্ফীতির ওপর। গত মাসে মুদ্রাস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ২.৭ শতাংশে। ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েল গত ডিসেম্বরেই জানিয়েছিলেন যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত ২ শতাংশের লক্ষমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার পেছনে মূল কারণ হলো এই শুল্ক নীতি। যদিও প্রশাসন এই অস্বাভাবিক শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতার আইন বা আইইইপিএ ব্যবহার করেছে, তবে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের মধ্যে এ নিয়ে যথেষ্ট সংশয় দেখা দিয়েছে। আইনগত এই লড়াই এখন কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে আছে বিশ্ব বাণিজ্য মহল।

ট্রাম্পের শুল্ক নীতি মূলত সংরক্ষণবাদী অর্থনীতির বহিঃপ্রকাশ হলেও কিল ইনস্টিটিউটের এই তথ্য প্রমাণ করছে যে, শুল্ক যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণের পকেটেই আঘাত করে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের এই জটিল সমীকরণে আমেরিকা যখন নিজের অভ্যন্তরীণ বাজার রক্ষার দোহাই দিচ্ছে, তখন অতিরিক্ত মুদ্রাস্ফীতি মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার মান কমিয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপের হুমকি ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ফাটল সৃষ্টি করতে পারে। গ্রিনল্যান্ডের মতো ভূ-রাজনৈতিক ইস্যুকে বাণিজ্যের সাথে জড়িয়ে ফেলার কৌশলটি আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক শিষ্টাচারের জন্যও বড় একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।