এখন সময় ডেস্ক • প্রকাশিত: ৩০ অক্টোবার ২০২৫, ০৫:১২ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

ট্রাম্পের কঠোর নজরদারিতে নেতানিয়াহু

ট্রাম্পের কঠোর নজরদারিতে নেতানিয়াহু

এখন সময় ডেস্ক

গত সপ্তাহে মার্কিন প্রশাসনের একের পর এক কর্মকর্তা ইসরায়েল সফরে গিয়ে গাজায় যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে কাজ করছেন। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমে এই ধারাবাহিক সফরের জন্য নতুন একটি শব্দ ব্যবহার হয়েছে—“বিবি–সিটিং”—ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ডাকনাম ‘বিবি’–র সঙ্গে মিলিয়ে। তবে বিষয়টি শুধু তত্ত্বাবধান নয়; যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল সম্পর্ক এখন এক নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে দুই দেশের নেতাদের পারস্পরিক সমীকরণ বদলে গেছে।

প্রথম মেয়াদে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে নানা রাজনৈতিক সুবিধা দিয়েছিলেন—জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি, গোলান মালভূমিতে ইসরায়েলের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি, এমনকি গাজা উপত্যকাকে “মধ্যপ্রাচ্যের রিভেরা” হিসেবে পুনর্গঠনের ধারণাও উসকে দিয়েছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ট্রাম্পের অবস্থান বদলেছে। মার্চে নেতানিয়াহু যুদ্ধবিরতি ভেঙে হামাসের ওপর হামলা চালালে ট্রাম্প প্রকাশ্যে সমর্থন দিলেও জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় বি–২ বোমার হামলা চালিয়ে ইসরায়েলকে অভূতপূর্ব সহায়তা দেন। হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি অধ্যাপক রিউভেন হাজান মন্তব্য করেন, “ইসরায়েলে তখন বলা হতো—ট্রাম্প আসলে আমাদেরই হয়ে কাজ করছেন।”

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্পের নেতানিয়াহুকে নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ্যে এসেছে। জুনে ইরানে যুদ্ধবিরতির পর ইসরায়েলের বিমান হামলায় ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হন। গত মাসে কাতারে হামাস প্রতিনিধিদের ওপর ব্যর্থ হামলার পর তিনি নেতানিয়াহুকে ওভাল অফিসে ডেকে কাতারি প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করেন। ২০ অক্টোবর সিবিএসের ‘৬০ মিনিটস’ অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্টের জামাতা জ্যারেড কুশনার বলেন, “প্রেসিডেন্ট মনে করেছিলেন, ইসরায়েলি নেতৃত্ব কিছুটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল, তাই কঠোরভাবে হস্তক্ষেপ করা দরকার।” এরপর ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে গাজা শান্তি পরিকল্পনায় রাজি করান, যেখানে ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়—যা নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে বিরোধিতা করে আসছেন। পরে ট্রাম্প বলেন, “তার রাজি হওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। আমার সঙ্গে থাকতে হলে রাজি থাকতে হবে।”

সবকিছু সত্ত্বেও ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রেখেছে। সাম্প্রতিক জেরুজালেম সফরে ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রতি তার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন এবং হামাসকে সতর্ক করেছেন—যদি তারা ইসরায়েলিদের মরদেহ ফেরত না দেয়, “তবে অন্য দেশগুলোই ব্যবস্থা নেবে।” কিন্তু ইসরায়েলি সমাজে এখন প্রশ্ন উঠছে—ট্রাম্প কত দিন এই চাপ বজায় রাখবেন। অধ্যাপক হাজানের ভাষায়, “ট্রাম্পের ধৈর্য সীমিত। তিনি চিরকাল ‘বিবি–সিটার’ হতে পারবেন না। এখন প্রশ্ন, কে আগে ভাঙবে—ট্রাম্প না নেতানিয়াহু?”

গাজা যুদ্ধবিরতি বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্র এখন সরাসরি তত্ত্বাবধানে নেমেছে। দক্ষিণ ইসরায়েলের কিরিয়াত গাতে ২০০ মার্কিন সেনার সমন্বয়ে একটি সিভিল–মিলিটারি কোঅর্ডিনেশন সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গত সপ্তাহে কেন্দ্রটি পরিদর্শন করেন। এখান থেকে মার্কিন বাহিনী গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবাহ, নিরাপত্তা সমন্বয় এবং যুদ্ধবিরতির অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন নিজস্ব ড্রোন দিয়েও গাজার ওপর নজরদারি করছে, যাতে ঘটনাবলির স্বাধীন মূল্যায়ন পাওয়া যায়।

ইসরায়েলের গণমাধ্যমে বিশ্লেষকরা বলছেন, একসময় নেতানিয়াহু ট্রাম্পের সঙ্গে নিজেকে একই উচ্চতায় তুলে ধরেছিলেন। জেরুজালেম ও তেলআবিবে ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর মুখাবয়ব দেওয়া বিশাল বিলবোর্ড টাঙানো হয়েছিল—স্লোগান ছিল “অন্য লিগের খেলোয়াড়।” কিন্তু এখন পরিস্থিতি উল্টো। জনমত জরিপে ৪৮ শতাংশ ইসরায়েলি মনে করেন, দেশটি এখন “মার্কিন তত্ত্বাবধানে” চলছে। রবিবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে নেতানিয়াহু বাধ্য হয়ে বলেন, “ইসরায়েল একটি স্বাধীন রাষ্ট্র।” তিনি একই বাক্য দু’বার পুনরাবৃত্তি করেন—যা নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার প্রয়োজনীয়তাই স্পষ্ট করে।

ইসরায়েলে নির্বাচনের বছর সামনে। অতীতে ট্রাম্পের সমর্থন নেতানিয়াহুর প্রচারণায় বড় ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু এবার ট্রাম্প নিজেই তাঁর জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারেন। ইসরায়েলি নীতিবিশ্লেষক নিমরদ নভিক বলেন, “ট্রাম্প যদি এক পোস্টেই নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন, তাতেই তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নড়ে যেতে পারে।” তিনি আরও যোগ করেন, “হয়তো এখন নেতানিয়াহু বুঝতে পারছেন—নিজের রাজনৈতিক টিকে থাকার জন্য ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের পথ বন্ধ না করে, বরং সেই পথই খুলে দিতে হতে পারে।”

তথ্যসূত্র:The New York Times