যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি জানিয়েছেন যে তিনি একটি এমআরআই (MRI) পরীক্ষা করিয়েছেন। তার এই আকস্মিক প্রকাশ আবারও প্রশ্ন তুলেছে— প্রেসিডেন্টদের স্বাস্থ্য সম্পর্কিত তথ্য কতটা গোপন রাখা উচিত এবং জনগণের জানার অধিকার কোথায় সীমাবদ্ধ।
৭৯ বছর বয়সে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত ট্রাম্পের শারীরিক সক্ষমতা নিয়ে আগেও আলোচনার ঝড় উঠেছিল। তার সহযোগী ও উপদেষ্টারা দীর্ঘদিন ধরে তাকে সুস্বাস্থ্যের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তবে সম্প্রতি ওয়াল্টার রিড সামরিক চিকিৎসাকেন্দ্রে তার দ্বিতীয়বারের চিকিৎসা পরিদর্শনকে ঘিরে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়। যদিও হোয়াইট হাউস জানিয়েছিল, এটি ছিল কেবল একটি নিয়মিত ফলোআপ পরীক্ষা।
চিকিৎসকের বিবৃতিতে ট্রাম্পকে “সামগ্রিকভাবে চমৎকার স্বাস্থ্যের অধিকারী” বলা হলেও, পরে তিনি নিজেই জানান যে ওই সময় এমআরআই ও কগনিটিভ টেস্ট করানো হয়েছিল। “আমি এমআরআই করিয়েছি, ফলাফল একদম নিখুঁত,” বলেন ট্রাম্প এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে। তবে তিনি পরীক্ষার কারণ বা শরীরের কোন অংশের এমআরআই হয়েছে— তা জানাননি। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিটও এই বিষয়ে কোনো অতিরিক্ত তথ্য দেননি।
হোয়াইট হাউসের সাবেক চিকিৎসক জেফ্রি কুলম্যান বলেন, প্রেসিডেন্টের বয়স বিবেচনায় এমআরআই করানো অস্বাভাবিক কিছু নয়। তিনি ব্যাখ্যা করেন, “হোয়াইট হাউসে আমরা অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারি, তবে উন্নত ইমেজিংয়ের জন্য ওয়াল্টার রিডে যাওয়া লাগে।” তবু তিনি প্রশ্ন তোলেন— কেন এত সময় লাগল। “দেখা যাচ্ছে প্রেসিডেন্ট অন্তত চার ঘণ্টা চিকিৎসা কেন্দ্রে ছিলেন, অথচ বেশিরভাগ পরীক্ষাই ১৫ মিনিটে শেষ করা সম্ভব,” বলেন কুলম্যান।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্টদের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্য গোপন রাখার প্রবণতা দীর্ঘদিনের। ইতিহাসে একাধিক প্রেসিডেন্ট তাদের অসুস্থতা আড়াল করেছেন— যেমন প্রেসিডেন্ট গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড ক্যানসারের অস্ত্রোপচার করেছিলেন একটি ইয়টে, উড্রো উইলসন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে অচল হয়ে পড়ার পরও তা গোপন রাখা হয়, আর জন এফ. কেনেডি দীর্ঘদিন অ্যাডিসন’স ডিজিজে ভুগলেও জনসমক্ষে কখনো স্বীকার করেননি।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও প্রেসিডেন্টের স্বাস্থ্য ইতিহাসবিদ জেকব অ্যাপেল বলেন, “যদি কোনো তথ্য আংশিকভাবে প্রকাশ করা হয়, তাহলে জনগণ বিভ্রান্ত হতে পারে। আপনি যদি বলেন এমআরআই করিয়েছেন, তবে জনগণের জানা উচিত সেটি কেন করানো হয়েছে।”
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য গবেষক এস. জে. ওলশানস্কি বলেন, “প্রেসিডেন্টদেরও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার রয়েছে, তবে শেষ পর্যন্ত জনগণকেই সিদ্ধান্ত নিতে হয় তারা কতটা বিশ্বাস করবে।”
সম্প্রতি ট্রাম্পের পা ফুলে থাকা ও হাতে দাগের ছবি ছড়িয়ে পড়লে হোয়াইট হাউস পরে জানায়, তার ‘ক্রনিক ভেনাস ইনসাফিসিয়েন্সি’ ধরা পড়েছে এবং হাতের দাগ হাত মেলানোর কারণে হয়েছে। ২০২০ সালে ট্রাম্প কোভিড-১৯ আক্রান্ত হলে প্রশাসন প্রথমে তা গোপন রাখে এবং পরে হালকাভাবে উপস্থাপন করে।
২০১৫ সালে তার চিকিৎসক হ্যারল্ড বর্নস্টেইন এক বিবৃতিতে লিখেছিলেন, ট্রাম্প হবেন “ইতিহাসের সবচেয়ে সুস্থ প্রেসিডেন্ট।” পরে বর্নস্টেইন স্বীকার করেন, চিঠিটি আসলে ট্রাম্পের নির্দেশেই লেখা হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশে এই ধোঁয়াশা তার আগের আচরণেরই ধারাবাহিকতা। প্রেসিডেন্টদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার প্রয়োজন থাকলেও, জনগণের জানার অধিকারকেও উপেক্ষা করা যায় না— বিশেষত যখন তা জাতীয় নেতৃত্বের স্থিতিশীলতার সঙ্গে জড়িত।
তথ্যসূত্র: PIX11 News