গাজায় যুদ্ধবিরতি সফলভাবে করাতে সক্ষম হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি এবার আরেকটি বড় বৈদেশিক নীতি অর্জনের পথে—চলতি বছরের মধ্যেই সৌদি আরবকে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিতে রাজি করাতে পারবেন।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্পের সেই আশা পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান, যিনি সাত বছর পর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন, তাঁর কাছে এখন আরও জরুরি অগ্রাধিকারের বিষয় রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন সৌদি যুবরাজের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, যা কয়েক মাস নয় বরং কয়েক বছর সময় নিতে পারে। আগামী নভেম্বরের মাঝামাঝি নির্ধারিত তাঁর এ সফরে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে বলে মার্কিন ও সৌদি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
এই চুক্তিটি কাতারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক নিরাপত্তা চুক্তির অনুরূপ হতে পারে বলে তারা জানান। পাশাপাশি, সৌদি আরব উন্নতমানের এফ–৩৫ যুদ্ধবিমান এবং মার্কিন প্রযুক্তি সহযোগিতায় বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি শুরু করার সুযোগও চাইছে।
যুবরাজের জন্য এই প্রতিরক্ষা ও পারমাণবিক চুক্তি হবে বড় ধরনের কূটনৈতিক অর্জন, যদিও এটি মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদিত পূর্ণাঙ্গ চুক্তি নাও হতে পারে। বাইডেন প্রশাসন এই দুটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছিল, তবে শর্ত ছিল—সৌদি আরবকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হবে। গাজা যুদ্ধ শুরুর পর এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলবিরোধী জনমত বেড়ে যাওয়ায় সে আলোচনা স্থগিত হয়ে যায়।
তবুও ট্রাম্প তাঁর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। অক্টোবরে টাইম ম্যাগাজিনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, সৌদি আরবের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়ে তিনি “খুব কাছাকাছি” পৌঁছে গেছেন এবং বছরের শেষ নাগাদ এটি ঘটবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
কিন্তু সৌদি বিশ্লেষক আলি শিহাবি মনে করেন, বছরের শেষের মধ্যে এমন কোনো সমঝোতা “প্রায় অসম্ভব”, যদি না ইসরায়েলে “অলৌকিক পরিবর্তন” ঘটে। তাঁর মতে, যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মনে করেন, ইসরায়েল যদি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের দিকে “অপরিবর্তনীয় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ” না নেয়, তাহলে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা সম্ভব নয়।
শিহাবি বলেন, ফিলিস্তিনিদের জন্য এখন একমাত্র কার্যকর কূটনৈতিক হাতিয়ার হলো সৌদি আরবের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্ভাব্য চুক্তি। “রাজ্য সেই কার্ড ব্যবহার করে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আনতে চায়,” তিনি যোগ করেন।
কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটি অসম্ভব। কারণ ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও তাঁর জোটের কট্টরপন্থীরা ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের বিপক্ষে। হামাসের ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর অনেক ইসরায়েলি নাগরিকও একই মনোভাব পোষণ করেন। তাদের কাছে সৌদি সম্পর্কের চেয়ে নিরাপত্তা এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র ঠেকানোই অগ্রাধিকার।
কুয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সহকারী অধ্যাপক বাদের আল-সাইফ বলেন, ট্রাম্পের এমন বক্তব্য তাঁকে মনে করিয়ে দেয় “একজন লাইফ কোচের কথা, যিনি শুধু বিশ্বাসের জোরে ভবিষ্যৎ তৈরি করতে চান।” তাঁর মতে, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সমস্যার মূল কারণগুলো না মিটলে এমন পরিবর্তন অসম্ভব।
এদিকে সৌদি নাগরিকদের মনোভাবও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৩ সালের শেষ দিকে এক জরিপে দেখা গেছে, বিপুল সংখ্যক সৌদি নাগরিক ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের বিপক্ষে। যদিও রাজ্যে স্বৈরাচারী শাসন আরও দৃঢ় হয়েছে, তবুও যুবরাজকে জনমত বিবেচনায় রাখতে হয়।
এই সফরটি যুবরাজের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ২০১৮ সালে তিনি শেষবার যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়েছিলেন। তিন সপ্তাহের সেই সফরে তিনি ট্রাম্পসহ যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যম নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং নারীর অধিকার বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যের বার্তা দেন। কিন্তু অল্প কিছুদিন পর ওয়াশিংটন পোস্টের সাংবাদিক জামাল খাসোগিকে সৌদি কনস্যুলেটে হত্যার ঘটনায় তিনি বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন। সিআইএ-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, খাসোগি হত্যায় যুবরাজের অনুমোদন ছিল।
যুবরাজ সরাসরি জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করলেও দায় স্বীকার করেন দেশের নেতা হিসেবে। তবুও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিমা দুনিয়ার নিন্দা কমে যায়, এবং ২০২২ সালে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন নিজেও সৌদি সফরে গিয়ে যুবরাজের সঙ্গে “ফিস্ট বাম্প” বিনিময় করেন।
এবারের সফরে যুবরাজ যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসছেন এক নতুন রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে। তাঁর সমর্থকেরা বলছেন, এটি হবে অতীতের বিতর্ক ভুলে যাওয়ার এক নতুন অধ্যায়।
গত মে মাসে ট্রাম্পও সৌদি আরব সফর করেন, যা ছিল তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে প্রথম বিদেশ সফর। তিনি যুবরাজের সংস্কারমূলক পদক্ষেপের প্রশংসা করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আর “আপনাদের কীভাবে বাঁচতে হবে তা শেখাবে না।”
রিয়াদে অনুষ্ঠিত এই বছরের বিনিয়োগ সম্মেলনে হাজারো কর্মকর্তা, উদ্যোক্তা ও ব্যাংকার অংশ নেন। সেখানে মূল আলোচ্য ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রাজ্যের বিভিন্ন মেগা প্রকল্প। তবে গাজা পুনর্গঠন বা ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়ে কোনো বিশেষ আলোচনা হয়নি।
এ বিষয়ে একমাত্র মন্তব্য আসে ট্রাম্প প্রশাসনের সাবেক উপ–জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ডিনা পাওয়েলের কাছ থেকে, যিনি আব্রাহাম চুক্তির প্রশংসা করেন—যে চুক্তিতে ২০২০ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে।
আন্তর্জাতিক সংকটগ্রুপের উপসাগর ও আরব উপদ্বীপ বিষয়ক পরিচালক ইয়াসমিন ফারুক বলেন, “সৌদি আরব বারবার বলেছে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নিশ্চয়তা ছাড়া এমন কোনো চুক্তি সম্ভব নয়।”
তবে তাঁর মতে, এটি একেবারে অসম্ভবও নয়। কারণ ওয়াশিংটনের অনুকম্পা পেতে উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রলোভন সবসময়ই থাকবে। তাই, ফারুক বলেন, “স্বাভাবিকীকরণের বিষয়টি আলোচনার টেবিল থেকে কখনোই পুরোপুরি সরে যাবে না।” তথ্যসূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস