এখন সময় ডেস্ক • প্রকাশিত: ০৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৫:৩৭ পিএম • অনলাইন সংস্করণ

ট্রাম্পের অর্থনীতি ও অভিবাসন নীতি: জনমতের কাঠগড়ায় হোয়াইট হাউস

ট্রাম্পের অর্থনীতি ও অভিবাসন নীতি: জনমতের কাঠগড়ায় হোয়াইট হাউস

২০২৪ সালের নির্বাচনে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এখন এক গভীর সংকটের মুখে। বিশেষ করে দেশের অর্থনীতি এবং জনমত জরিপ বা পোলিং ডাটা নিয়ে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে যে দাবিগুলো করা হচ্ছে, বাস্তব চিত্র তার ঠিক উল্টো। সিএনএন-এর সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, আমেরিকানরা বর্তমান সরকারের অর্থনৈতিক পদক্ষেপে কেবল অসন্তুষ্টই নয়, বরং তারা মনে করছে দেশ ভুল পথে এগোচ্ছে। নির্বাচনের এক বছর পার হতে না হতেই ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় যে ধস নেমেছে, তা আগামী মিডটার্ম নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয়ের সংকেত দিচ্ছে।

সিএনএন-এর প্রধান তথ্য বিশ্লেষক হ্যারি এন্টন জানিয়েছেন, ট্রাম্প সম্প্রতি দাবি করেছিলেন যে অর্থনীতির ক্ষেত্রে তার রেটিং ঊর্ধ্বমুখী। কিন্তু তথ্যের চুলচেরা বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ২০২৪ সালে পুনঃনির্বাচিত হওয়ার সময় যেখানে ৪২ শতাংশ মানুষ মনে করতেন অর্থনীতি খারাপের দিকে যাচ্ছে, বর্তমানে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫ শতাংশে। অধিকাংশ আমেরিকানের মতে, ট্রাম্পের জমানায় জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়ার বদলে আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। একজন প্রেসিডেন্ট হিসেবে যখন দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষ অর্থনীতি নিয়ে হতাশ থাকেন, তখন সেই প্রশাসনকে রাজনৈতিকভাবে সফল বলা দুরূহ।

জরিপ অনুযায়ী, আমেরিকানদের প্রধান উদ্বেগের জায়গা হলো দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি বা ইনফ্লেশন। ৫৪ শতাংশ ভোটারের মতে, সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত নিত্যপণ্যের দাম কমানো। অথচ ট্রাম্প প্রশাসন তাদের শক্তির সিংহভাগ ব্যয় করছে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ (২২%) এবং অপরাধ দমনে (১০%)। যদিও ট্রাম্পের সমর্থকরা এই দুটি ইস্যুকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন, কিন্তু সাধারণ আমেরিকানদের পকেট যখন টান পড়ছে, তখন সীমানা প্রাচীর বা অপরাধ দমন তাদের কাছে গৌণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এন্টন মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসন ভুল জায়গায় গুরুত্ব দিচ্ছে, যা ডেমোক্র্যাটদের জন্য মিডটার্ম নির্বাচনে বিশাল সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে। বিশেষ করে স্বতন্ত্র ভোটারদের মধ্যে ডেমোক্র্যাটরা এখন ৩৯ পয়েন্টে এগিয়ে আছে, যা একটি বিশাল ব্যবধান।

স্বাস্থ্যসেবা নিয়েও ট্রাম্পের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা প্রশ্নের মুখে। ট্রাম্প সম্প্রতি ‘ট্রাম্প আরএক্স’ (Trump RX) নামক ওয়েবসাইট চালুর মাধ্যমে ওষুধ সস্তা করার দাবি তুলেছেন, এমনকি তিনি স্বাস্থ্যসেবা পরিকল্পনাকে নিজের নামে ‘ট্রাম্প কেয়ার’ হিসেবে পরিচিত করতে চান। কিন্তু ডেমোক্র্যাটরা ঐতিহাসিকভাবে স্বাস্থ্যসেবা খাতে ভোটারদের বেশি আস্থা অর্জন করে আসছে। ডেমোক্র্যাট দাতা ও ভেনচার ক্যাপিটালিস্ট অলিভার লিবির মতে, আমেরিকার এই অর্থনৈতিক অস্থিরতা কাটাতে ‘স্ট্রং ফ্লোর, নো সিলিং’ (Strong Floor, No Ceiling) নীতি অনুসরণ করা জরুরি। এর অর্থ হলো প্রত্যেক নাগরিকের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং বাসস্থানের একটি শক্তিশালী ভিত্তি নিশ্চিত করা, যাতে কেউ পড়ে না যায়, আবার পরিশ্রমীদের জন্য উন্নতির কোনো সীমাবদ্ধতা না থাকে।

ভূ-রাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের ভবিষ্যৎ

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত হলো, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের এই প্রাথমিক ধাক্কা মূলত তার অতি-ডানপন্থী এজেন্ডা এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনের মধ্যকার ফারাক থেকে তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্প প্রশাসন মনে করেছিল অভিবাসন ও জাতীয়তাবাদের তাস খেলে তারা জনমত ধরে রাখতে পারবে। কিন্তু মুদ্রাস্ফীতি যখন মধ্যবিত্তের রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তখন আদর্শিক বুলিতে পেট ভরে না। হ্যারি এন্টনের মতো বিশ্লেষকদের মতে, "X + Y = Failure" সমীকরণে ট্রাম্প এখন আটকা পড়েছেন। এখানে X হলো ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক হতাশা এবং Y হলো ভুল ইস্যুতে মনোযোগ। এই দুয়ের যোগফল কেবল নির্বাচনী পরাজয়ই নয়, বরং রিপাবলিকান পার্টির দীর্ঘমেয়াদী ইমেজ সংকটের কারণ হতে পারে।

বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, ডেমোক্র্যাটরা যদি কেবল ট্রাম্পের সমালোচনা না করে অলিভার লিবির মতো ‘আশাবাদী ও ইতিবাচক’ কোনো অর্থনৈতিক রোডম্যাপ দিতে পারে, তবে তারা হোয়াইট হাউসের নিয়ন্ত্রণ পুনর্দখল করতে পারবে। আমেরিকানরা এখন এমন একজন নেতা চায় যিনি তাদের গ্রোসারি বিল এবং ওষুধের খরচ কমাতে পারবেন। স্বাস্থ্যসেবা খাতে ট্রাম্পের হস্তক্ষেপকে বিশ্লেষকরা দেখছেন ডেমোক্র্যাটদের দীর্ঘদিনের ‘একচেটিয়া’ ইস্যু কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা হিসেবে। তবে ট্রাম্প যদি সত্যি ওষুধের দাম কমাতে না পারেন, তবে ‘ট্রাম্প আরএক্স’ তার জন্য বড় এক রাজনৈতিক ব্যুমেরাং হয়ে দাঁড়াবে। আগামী মিডটার্ম নির্বাচন কেবল আসন দখলের লড়াই নয়, এটি হবে ট্রাম্পের অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের গ্রহণযোগ্যতার চূড়ান্ত লিটমাস টেস্ট।